ব্রেকিং
ফ্রান্সে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের বিক্ষোভ, আগুনে পুড়ল ঐতিহাসিক নগর ভবনইরান সংঘাতের আগুনে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি, তেল-জ্বালানির ঊর্ধ্বগতিতে চাপে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র, ‘নো কিংস’ সমাবেশ থেকে আগাম ভোটের ডাকইলহান ওমরের নাগরিকত্ব নিয়ে তদন্ত, পুরোনো নথি ঘিরে নতুন বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রেট্রাম্পের নতুন শিক্ষাবৃত্তি পরিকল্পনা, ২০২৭ সালে গৃহশিক্ষায় মিলতে পারে আর্থিক সুবিধা

ইরান সংঘাতের আগুনে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি, তেল-জ্বালানির ঊর্ধ্বগতিতে চাপে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ

ইরানকে ঘিরে সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ।

ইরান সংঘাতের আগুনে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি, তেল-জ্বালানির ঊর্ধ্বগতিতে চাপে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ
ইরান সংঘাতের আগুনে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি, তেল-জ্বালানির ঊর্ধ্বগতিতে চাপে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাব ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধি, তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা এবং পরিবহন ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও বিভিন্ন জ্বালানিপণ্যের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

১৮ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর আগের সময়ের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পণ্য পরিবহন, বিমানযাত্রা এবং বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে জ্বালানির বাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতা এখন শুধু তেল ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সংঘাতের কারণে দেশটির একটি গড় পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় দুই হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে অর্থনীতিবিদেরা হিসাব করেছেন। এর মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত ব্যয় প্রায় এক হাজার একশ ডলার। তবে এই হিসাব একটি অনুমাননির্ভর সামগ্রিক মূল্যায়ন; প্রতিটি পরিবারের প্রকৃত ব্যয় এক নয়। গাড়ি ব্যবহারের পরিমাণ, যাতায়াতের দূরত্ব, বাসস্থান এবং আয়ের ওপর নির্ভর করে পরিবারের ব্যয়ের চাপ কমবেশি হতে পারে।

সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগকারী এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। এখানে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সংঘাতের মধ্যে জাহাজে হামলা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং বিকল্প পথে পণ্য পরিবহনের প্রয়োজনীয়তা জ্বালানি বাজারকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

১৪ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছিল। ওই দিন ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০৬ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেলের দামও বেড়ে যায়। তবে এই মূল্য নির্দিষ্ট দিনের বাজারদর; একে ১৮ অক্টোবরের বর্তমান দর হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। আন্তর্জাতিক তেলের দাম প্রতিদিনই সরবরাহ, চাহিদা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের ধারণার ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয়।

তেলের বাজারে অস্থিরতার আরেকটি বড় কারণ পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি। রয়টার্সের ১৫ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাপানে তেল বহনকারী একটি বৃহৎ জাহাজের সম্ভাব্য যাত্রাব্যয় প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে। আগের বছরের গড় ব্যয়ের তুলনায় এই অঙ্ক প্রায় নয় গুণ। প্রতিবেদনটিতে জাহাজের ভাড়া, নিরাপত্তাঝুঁকি, বিমা এবং দীর্ঘতর সমুদ্রপথ ব্যবহারের কারণে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

পরিবহন ব্যয় বাড়লে তেল আমদানিকারকদের শুধু বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয় না, সেটি গন্তব্যে পৌঁছানোর খরচও বহন করতে হয়। পরিশোধনাগারগুলো সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পেট্রল, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির দামে যুক্ত করতে পারে। এরপর ট্রাক, জাহাজ ও অন্যান্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে খাদ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের দামেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিমানযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে কয়েকটি বিমান সংস্থা ভাড়া বাড়িয়েছে এবং কিছু রুটে চলাচল কমিয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও ট্রাকভাড়ার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান সেই ব্যয় নিজে বহন করতে পারে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর তার একটি অংশ চাপিয়ে দিতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জ্বালানি শুধু যানবাহন চালানোর জন্য প্রয়োজন হয় না; কৃষি উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষিপণ্য ও খাদ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম এবং পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তন সামাল দিতে হয়। এসব দেশে আমদানি ব্যয় বাড়লে সরকারি ভর্তুকি, পরিবহনভাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতেও আন্তর্জাতিক বাজারের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে বাংলাদেশের বাজারে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে আমদানির চুক্তি, মজুত, বিনিময় হার, সরকারি মূল্যনীতি এবং বিকল্প সরবরাহের ওপর।

এদিকে রাশিয়া থেকে জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্নটিও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাচ্ছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক প্রয়োগের অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনায় ট্রাম্প প্রশাসন সময় নেওয়ার কথা জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এ বিষয়ে মূল্যায়নে সর্বোচ্চ ৬০ দিন লাগতে পারে। প্রশাসনের বিবেচনায় জ্বালানির দাম, সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেই জ্বালানির দাম নিশ্চিতভাবে কমবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। সংঘাত কমলে পরিবহন ও বিমা ব্যয় হ্রাস পেতে পারে। বিপরীতে, জাহাজে হামলা বা সরবরাহে নতুন বাধা তৈরি হলে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

ইরানকে ঘিরে সংঘাত এখন সামরিক ও কূটনৈতিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়, ব্যবসার উৎপাদন খরচ এবং বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আরও কঠিন হতে পারে। পরিস্থিতি কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ কোন দিকে এগোয় তার ওপর।


ট্যাগ: ইরানবিশ্বঅর্থনীতি

প্রতিবেদক

CSB News USA

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।