মালয়েশিয়ায় বিশাল অভিবাসন অভিযানে ১৯৯ জন বাংলাদেশিসহ আটক ৬৩০ বিদেশি নাগরিক
মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যে ইমিগ্রেশন বিভাগের সাঁড়াশি অভিযানে ১৯৯ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৬৩০ জন অবৈধ বিদেশি শ্রমিক আটক হয়েছেন।
৪ মিনিটে পড়ুন
মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের অবৈধভাবে বসবাস ও কাজের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় কেদাহ রাজ্যের কুলিমের পাডাং মেহা এলাকায় একটি সুবিশাল নির্মাণাধীন ভবনে বিশাল এক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ। অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে বৈধ কাগজপত্র না থাকা এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করার অপরাধে ১৯৯ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৬৩০ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কেদাহ রাজ্য অভিবাসন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রিদজুয়ান মোহাম্মদ জেইন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কয়েক সপ্তাহের টানা নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই অভিযান চালানো হয়। এই বিশেষ তল্লাশি অভিযানে কেদাহ, পেরাক এবং কুয়ালালামপুরসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যের অভিবাসন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ কৌশলী দলের মোট ১৫৯ জন কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
অভিযান চলাকালে ওই নির্মাণাধীন এলাকার বিশাল চত্বর ও বহুতল ভবনে কর্মরত মোট ৬৯৭ জন দেশি-বিদেশি মানুষের নথিপত্র এবং কাজের অনুমতিপত্র নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। এর মধ্যে যাদের বৈধ পাসপোর্ট, কাজের পারমিট বা কোনো ধরনের বৈধ অভিবাসন নথি পাওয়া যায়নি, তাদের মধ্য থেকে ৬৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আটককৃতদের বয়স ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। এই বিশাল দলের মধ্যে ৬২২ জন পুরুষ এবং আটজন নারী রয়েছেন।
জাতীয়তা ভিত্তিক পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে দেখা যায়, এই অভিযানে আটককৃতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় রয়েছেন চীনেরনাগরিক। মোট ৩৯৬ জন চীনা নাগরিককে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৯১ জন পুরুষ এবং পাঁচজন নারী। এই তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ। মোট ১৯৯ জন বাংলাদেশি এই অভিযানে আটক হন, যার মধ্যে ১৯৮ জন পুরুষ ও একজন নারী শ্রমিক রয়েছেন। এ ছাড়া আটক হওয়া অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন ১০ জন পাকিস্তানি, সাতজন মিয়ানমারের নাগরিক, পাঁচজন ভারতীয়, চারজন ঘানার নাগরিক, তিনজন নাইজেরিয়ার, দুজন কেনিয়ার, দুজন ইন্দোনেশিয়ার এবং নিউজিল্যান্ড ও সেনেগালের একজন করে নাগরিক।
অভিযানটি পরিচালনাকালে অভিবাসন কর্মকর্তাদের ব্যাপক বেগ পেতে হয়েছে এবং বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আচমকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে নির্মাণাধীন ভবনের শত শত শ্রমিক দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। অনেকে নিজেদের গ্রেপ্তার এড়াতে বহুতল ভবনের বিপজ্জনক কাঠামো, লিফটের ফাঁকা গর্ত এবং অসম্পূর্ণ ছাদে গিয়ে লুকিয়ে পড়েন। শুধু তাই নয়, অভিযানের একপর্যায়ে আটককৃত শ্রমিকদের একটি উগ্র দল কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে উসকানিমূলক আচরণ শুরু করে, যার ফলে সেখানে তীব্র এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব এবং তাৎক্ষণিক দৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।
উদ্ধার ও তল্লাশি কার্যক্রম আরও কঠিন করে তুলেছিল ওই দিনের বৈরী আবহাওয়া ও পরিবেশ। প্রায় পাঁচ লাখ বর্গমিটার বিস্তৃত বিশাল এই কর্মক্ষেত্রে ভারী বর্ষণের কারণে মাটি ও মেঝে পিচ্ছিল হয়ে কাদার স্তূপে পরিণত হয়েছিল। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধারালো লোহার রড, উন্মুক্ত গর্ত, নির্মাণসামগ্রী ও ভারী যন্ত্রপাতির কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল। এই সমস্ত নিরাপত্তা ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
গ্রেপ্তারকৃত সব প্রবাসীর বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার ১৯৫৯/৬৩ সালের অভিবাসন আইনের ধারা ৬(১)(সি) ও ১৫(১)(সি) এবং ১৯৬৩ সালের অভিবাসন বিধিমালার ৩৯(বি) বিধি অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এই আইনগুলোর অধীনে বৈধ নথি ছাড়া দেশে প্রবেশ, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা এবং কাজের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। অধিকতর তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের ইমিগ্রেশন ডিপোতে স্থানান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই অবৈধ কর্মসংস্থানের পেছনের মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে এবং তদন্তের স্বার্থে তথ্য জোগাড় করতে স্থানীয় বেশ কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমন জারি করা হয়েছে।
এই ভয়াবহ অভিযানের পর মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ দেশের সব নিয়োগকর্তা, প্রধান ঠিকাদার এবং উপঠিকাদারদের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে। কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যেক কর্মীর বৈধ ভ্রমণ নথি এবং সরকার অনুমোদিত ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের পাস থাকা বাধ্যতামূলক। যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন অমান্য করে অবৈধ অভিবাসীদের আশ্রয় দেয় বা কাজে নিয়োগ করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং কঠোর আইনি জরিমানা ও শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অবৈধভাবে বসবাসের প্রবণতা শূন্যে নামিয়ে আনতে এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান আগামী দিনগুলোতেও নিয়মিত এবং জোরালোভাবে অব্যাহত থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।





