কুড়িগ্রামে একই পরিবারের ছয়জন মানসিক অসুস্থ, অভাবে চিকিৎসাহীন জীবন কাটছে মায়ের সংসারে
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে একই পরিবারের ছয় সদস্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। অসুস্থতা, দারিদ্র্য ও চিকিৎসার অভাবে অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন মা দোলেনা বেগম।
কুড়িগ্রামে একই পরিবারের ছয়জন মানসিক অসুস্থ, অভাবে চিকিৎসাহীন জীবন কাটছে মায়ের সংসারে
৭ মিনিটে পড়ুন
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার একটি অসহায় পরিবারের দুর্দশার চিত্র সামনে এসেছে। স্বামী, স্ত্রী ও চার সন্তান পরিবারের ছয় সদস্যই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন বলে পরিবারের সদস্যদের বরাতে প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়েছে। উপার্জন করার মতো সক্ষম কেউ না থাকায় খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপদ বাসস্থানের সংকটে দিন কাটছে তাঁদের। নিজের অসুস্থতা নিয়েও অন্যের বাড়িতে কাজ করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন মা দোলেনা বেগম। সামান্য উপার্জনের সঙ্গে সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতার অর্থ যোগ করেও পরিবারের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর প্রকাশিত কালবেলার প্রতিবেদন এবং ৬ অক্টোবর প্রকাশিত মুক্তকণ্ঠের সংবাদে পরিবারটির দুর্দশার কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনগুলোতে পরিবারের ঠিকানা হিসেবে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের গাবুর হেলান গ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যের জমিতে তৈরি জরাজীর্ণ একটি ঘরে বসবাস করছে পরিবারটি। নিজস্ব জমি কিংবা স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকায় তাদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যরা হলেন ৬৫ বছর বয়সী রঞ্জন, তাঁর স্ত্রী ৫৫ বছর বয়সী দোলেনা বেগম এবং তাঁদের চার সন্তান—৩০ বছর বয়সী রনজি খাতুন, ২৩ বছর বয়সী দেলোয়ার, ২০ বছর বয়সী অধিফা খাতুন ও ১৭ বছর বয়সী দানিয়েল। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রঞ্জন জন্ম থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদেরও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের অসুস্থতার ধরন, তীব্রতা ও কারণ নির্ধারণে বিস্তারিত চিকিৎসাগত পরীক্ষার তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
পরিবারটির দুর্দশার সবচেয়ে কঠিন দিক হলো, একদিকে অসুস্থতা, অন্যদিকে দারিদ্র্য। সাধারণত একটি পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে অন্য সদস্যরা তাঁর দেখাশোনা করেন, প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করেন কিংবা চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এই পরিবারে প্রায় সবাই সহায়তার প্রয়োজন নিয়ে বেঁচে আছেন। ফলে নিয়মিত কাজ করে আয় করা, নিজেদের প্রয়োজন মেটানো এবং অসুস্থ সদস্যদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব সামলানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের একমাত্র বড় ভরসা দোলেনা বেগম। নিজের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যান। দিন শেষে সামান্য যে মজুরি পান, তা দিয়ে ছয়জনের খাবারের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতার অর্থও তাঁদের সংসার চালাতে সহায়তা করে। সংবাদে বলা হয়েছে, ভাতার অর্থ তিন মাস পরপর হাতে আসে। কিন্তু খাবার, পোশাক, বাসস্থান এবং চিকিৎসার মতো নিয়মিত ব্যয়ের তুলনায় এই অর্থ অপ্রতুল। নিজের জীবনের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে দোলেনা বেগমের বক্তব্যেও অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। স্বামী কাজ করতে পারেন না, সন্তানদেরও অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও উপার্জন কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক কষ্টে চার সন্তানকে বড় করেছেন তিনি। তবু পরিবারের সবার জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে পারছেন না। দোলেনার এই সংগ্রাম কেবল একজন মায়ের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; বরং দারিদ্র্য ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে একটি পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি সংকটে আটকে থাকার চিত্রও তুলে ধরে। পরিবারটির বাসস্থানও উদ্বেগজনক। অন্যের জমিতে তৈরি একটি জরাজীর্ণ ঘরই তাঁদের আশ্রয়। নিজস্ব জমি না থাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা নেই। ঘরের অবস্থা, পর্যাপ্ত খাবারের অভাব এবং চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পারার মতো সমস্যা একসঙ্গে তাঁদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। অসুস্থ সদস্যদের জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও এমন পরিস্থিতিতে কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে রয়েছে। সরকারি সহায়তা বাড়ানো এবং সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁরা বলেছেন। তবে শুধু এককালীন আর্থিক সহায়তা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, নিয়মিত খোঁজখবর, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার এবং নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করাও জরুরি। এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তার বক্তব্যও সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে। কালবেলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ববিতা খাতুন জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্যরা সরকারি ভাতার আওতায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে সরকারিভাবে নতুন কোনো সুযোগ-সুবিধা এলে তাঁদের দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। অন্যদিকে, কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন চিকিৎসা সহায়তার বিষয়ে বলেছেন, পরিবারটি হাসপাতালে এলে তাঁদের চিকিৎসার ব্যাপারে সহায়তা করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সহায়তার সম্ভাবনার কথা থাকলেও পরিবারের জন্য বিশেষ চিকিৎসা বা অতিরিক্ত সহায়তা ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিবারটির পরিস্থিতি নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিক অসুস্থতার বংশগত ঝুঁকি। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কিছু মানসিক রোগের ক্ষেত্রে বংশগত বৈশিষ্ট্য ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারের কারও নির্দিষ্ট মানসিক রোগ থাকলে তাঁর নিকটাত্মীয়দের মধ্যে কিছু রোগের ঝুঁকি সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় বেশি হতে পারে। তবে বংশগত ঝুঁকি থাকা মানেই পরবর্তী প্রজন্মের সবাই একই রোগে আক্রান্ত হবেন, এমন নয়। পরিবেশ, জীবনের অভিজ্ঞতা, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য জৈবিক উপাদানও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিবারের ছয়জনের মধ্যে একই ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ার পেছনে বংশগত কারণ রয়েছে কি না, তা কেবল সংবাদ বিবরণ থেকে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রত্যেক সদস্যের রোগের ধরন, উপসর্গের ইতিহাস, বয়স এবং পারিবারিক ইতিহাস মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাই চিকিৎসকের পরীক্ষা ছাড়া তাঁদের সবাইকে একই রোগে আক্রান্ত বলা কিংবা রোগের কারণ হিসেবে সরাসরি বংশগতিকে দায়ী করা যথাযথ হবে না।
মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা নিয়েও সমাজে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মানেই চিকিৎসার সুযোগ নেই, কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তি কখনোই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন না—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। রোগের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, মনোসামাজিক সহায়তা এবং পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় অনেকেই উপকৃত হতে পারেন। তবে কারও সুস্থতার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না; চিকিৎসার ফল ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।
এই পরিবারের ক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োজন প্রত্যেক সদস্যের আলাদা স্বাস্থ্য মূল্যায়ন। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি, ওষুধের প্রয়োজন নির্ধারণ এবং নিয়মিত অনুসরণ নিশ্চিত করা দরকার। পরিবারের পক্ষে নিজেরা চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব না হলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজসেবা দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অসুস্থতার কারণে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের যত্ন নিতে না পারলে তাঁদের খাবার, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্যও সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
একই সঙ্গে দোলেনা বেগমের ওপর নির্ভরশীলতার চাপ কমানো জরুরি। নিজের অসুস্থতা নিয়েও তাঁকে পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন এমন চাপ বহন করলে তাঁর নিজের স্বাস্থ্য ও কাজ করার সক্ষমতাও আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পরিবারের খাদ্যসহায়তা, নিয়মিত সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা, প্রয়োজনভিত্তিক আর্থিক সহায়তা এবং নিরাপদ আবাসনের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা অসচ্ছল মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। তবে কোনো পরিবারে একাধিক সদস্য অসুস্থ হলে এবং উপার্জনের সক্ষমতা সীমিত থাকলে শুধু ভাতার ওপর নির্ভর করে সব প্রয়োজন মেটানো কঠিন হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা, নথিপত্র এবং বিদ্যমান সুবিধার ভিত্তিতে অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ আছে কি না, তা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পথও তাঁদের জন্য সহজ করা দরকার।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: মানসিক অসুস্থতায় ভোগা মানুষদের অবজ্ঞা, অপমান কিংবা বিদ্রূপ নয়, বরং মর্যাদা ও সহমর্মিতার সঙ্গে দেখা উচিত। স্থানীয় মানুষ, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সম্মিলিত উদ্যোগ পরিবারটির দুর্ভোগ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁদের সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্ত রাখা এবং নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, পরিবারটির দুরবস্থা, সদস্যসংখ্যা, দোলেনা বেগমের সংগ্রাম এবং চিকিৎসাসহায়তার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে সবার রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত পরিচয়, বংশগত কারণ, পরিবারের মোট আয় এবং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তাই এসব বিষয়ে নিশ্চিত দাবি না করে পরিবারের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই সংবাদটি উপস্থাপন করা সমীচীন। কুড়িগ্রামের এই পরিবারটির জীবনসংগ্রাম মনে করিয়ে দেয়, দারিদ্র্য ও মানসিক অসুস্থতা একসঙ্গে দেখা দিলে একটি পরিবার কতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারে। দোলেনা বেগমের একার চেষ্টায় ছয়জনের সংসার চালানো দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত খাবার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ ও সমাজের সম্মিলিত সহায়তা পেলে পরিবারটির জীবনযাত্রার কষ্ট কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতে পারে।