ব্রেকিং
গ্রিনল্যান্ডে তেল গ্যাস খনিজ অনুসন্ধান শুরুর ঘোষণা ট্রাম্পের, নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্কসৌদির ফ্লাইট বিপর্যয়ে বিপাকে বাংলাদেশিরা, তিন দিনে বাতিল ৮২ ফ্লাইট, দুর্ভোগে ১৩ হাজার যাত্রীনিউইয়র্কে অ্যামাজন কেন্দ্রের বাইরে গুলিতে আহত দুই কর্মী, সন্দেহভাজনরা পালিয়েছে সাদা গাড়িতেসুদের হার বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি নিয়ে সতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদেড় কোটি অভিবাসীর দাবি ঘিরে কানাডার সরকারি পরিকল্পনা ও বাস্তবতার বড় প্রশ্ন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে কাতারের রাজস্ব ৪২ শতাংশ কমল, জ্বালানি রপ্তানিতে বড় ধরনের সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ও গ্যাস স্থাপনায় হামলায় কাতারের আয় কমেছে, ব্যাহত হয়েছে রপ্তানি, বাড়ছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের উদ্বেগ।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে কাতারের রাজস্ব ৪২ শতাংশ কমল, জ্বালানি রপ্তানিতে বড় ধরনের সংকট
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে কাতারের রাজস্ব ৪২ শতাংশ কমল, জ্বালানি রপ্তানিতে বড় ধরনের সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের বড় অর্থনৈতিক ধাক্কায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কাতারের জ্বালানি রপ্তানি ও সরকারি আয়। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটির মোট সরকারি রাজস্ব ৪২ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। গত ১৩ অক্টোবর দোহার শুরা পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। একই সময়ে সরকারি ব্যয়ও ১৪ শতাংশ কমেছে। তবে তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় জনসেবা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেছে সরকার।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং কাতারের আমিরের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে রাজস্ব কমার খবরটির সত্যতা পাওয়া যায়। তবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার সময় গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য মনে রাখা দরকার: ৪২ শতাংশ কমার হিসাবটি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের সরকারি রাজস্বের জন্য, এটি পুরো বছরের চূড়ান্ত হিসাব নয়। বছরের বাকি সময়ে আয় কতটা পুনরুদ্ধার হবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের পরিস্থিতি, জ্বালানি উৎপাদন এবং রপ্তানি পথ স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।

কাতারের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তিগুলোর একটি হলো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি। যুদ্ধের আগে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস সরবরাহকারী ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে উৎপাদনকেন্দ্রের ক্ষতি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হওয়ায় রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই প্রণালি পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে কাতারের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের আয় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কাতারের প্রধান গ্যাস উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র রাস লাফান শিল্পনগরীও সংঘাতের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় গ্যাস তরলীকরণের দুটি উৎপাদন ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির বার্ষিক রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ বন্ধ রয়েছে। এতে বছরে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টন গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা বাজারের বাইরে চলে গেছে। কাতারের জ্বালানিসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধ থেমে গেলেও আগের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা দ্রুত ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

রাজস্ব কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু কাতারের সরকারি হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে এশিয়া ও ইউরোপের আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়। বিকল্প সরবরাহের খরচ বেশি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। তবে সব দেশে এর প্রভাব সমান হবে না; সরবরাহের চুক্তি, মজুত, বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা এবং আমদানির উৎসের ওপর ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে।

বাংলাদেশের জন্যও পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে। রয়টার্সের ২০২৬ সালের জুলাই মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধজনিত সরবরাহ সমস্যার কারণে কাতার থেকে বাংলাদেশের নির্ধারিত গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ কমানোর কথা জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি কেনার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে এসব বিকল্প আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দেশের অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে কাতারের সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে। আমিরের বক্তব্য অনুযায়ী, সংকটের আগেই বৈদেশিক মুদ্রার মজুত শক্তিশালী করা, সরকারি ঋণ কমানো, তেল ও গ্যাসের দামের বিষয়ে সতর্ক বাজেট পরিকল্পনা এবং জ্বালানি-বহির্ভূত খাতের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ দেশটিকে ধাক্কা সামলাতে সহায়তা করছে। তিনি আরও বলেছেন, সংকটের মধ্যেও জরুরি জনসেবা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দেশটির অর্থনীতি বহুমুখী করার পরিকল্পনাও অব্যাহত রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে অবকাঠামো, বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব, আবাসন ও আতিথেয়তা খাতে প্রায় ২২১ বিলিয়ন কাতারি রিয়াল, অর্থাৎ প্রায় ৬০ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রকল্প ও সুযোগের কথা জানিয়েছেন আমির। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলীয় বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সম্প্রসারণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে একটি মাত্র খাতের ওপর নির্ভরশীল না রাখা।

অর্থনৈতিক পূর্বাভাসেও ঝুঁকির ইঙ্গিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৬ সালে কাতারের অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসে সংকোচনের মাত্রা এক নয় এবং যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলালে হিসাবও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কোনো একটি পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

কাতারের রাজস্ব ৪২ শতাংশ কমার খবরটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এবং আমিরের বক্তব্যের ভিত্তিতে সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মূল কারণ হিসেবে জ্বালানি স্থাপনার ক্ষতি, রপ্তানি ব্যাহত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কথা বলা হয়েছে। তবে কাতারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। যুদ্ধের অবসান, নিরাপদ নৌপরিবহন, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত এবং গ্যাস রপ্তানি পুনরুদ্ধারই দেশটির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান শর্ত হয়ে থাকবে।

ট্যাগ: কাতারকাতারের_অর্থনীতিমধ্যপ্রাচ্যের_যুদ্ধজ্বালানি_সংকট

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।