দেড় কোটি অভিবাসীর দাবি ঘিরে কানাডার সরকারি পরিকল্পনা ও বাস্তবতার বড় প্রশ্ন
আগামী দশকে কানাডায় দেড় কোটি অভিবাসী নেওয়ার দাবি সরকারি নথিতে মেলেনি; দেশটির প্রকাশিত পরিকল্পনায় স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের সীমিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে।
কানাডায় আগামী দশকে দেড় কোটি নতুন অভিবাসীর প্রয়োজন হবে—ভারতের হাইকমিশনারের নামে প্রচারিত এমন একটি বক্তব্য ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দাবি অনুযায়ী, দেশটির ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণ করতে বিপুলসংখ্যক নতুন অভিবাসী প্রয়োজন হবে। তবে বক্তব্যটির মূল সূত্র, প্রকাশের তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকের পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। কানাডা সরকারের প্রকাশিত অভিবাসন পরিকল্পনাতেও আগামী দশকে দেড় কোটি নতুন অভিবাসী নেওয়ার কোনো নিশ্চিত লক্ষ্য পাওয়া যায়নি।
কানাডার অভিবাসনবিষয়ক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৩ লাখ ৮০ হাজার স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, তিন বছরে স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের পরিকল্পিত সংখ্যা ১১ লাখ ৪০ হাজার। এই হিসাবের সঙ্গে আগামী দশকে দেড় কোটি নতুন অভিবাসী নেওয়ার দাবির বড় পার্থক্য রয়েছে। তবে তিন বছরের পরিকল্পনাকে সরাসরি দশ বছরের চূড়ান্ত পূর্বাভাস হিসেবেও বিবেচনা করা যাবে না, কারণ পরবর্তী বছরগুলোর নীতি পরিবর্তিত হতে পারে।
কানাডার প্রকাশিত পরিকল্পনায় শুধু স্থায়ী বাসিন্দা নয়, অস্থায়ী কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগমনের বিষয়টিও আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। ২০২৬ সালে নতুন অস্থায়ী বাসিন্দার আগমনের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৮৫ হাজার। ২০২৭ ও ২০২৮ সালে তা কমিয়ে প্রতি বছর ৩ লাখ ৭০ হাজার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সংখ্যার মধ্যে নির্দিষ্ট শ্রেণির অস্থায়ী কর্মী ও শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে স্থায়ী বাসিন্দা, অস্থায়ী কর্মী, শিক্ষার্থী এবং সামগ্রিক অভিবাসনপ্রবাহের হিসাব এক করে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
কানাডার অভিবাসননীতিতে শ্রমবাজারের চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশটির অর্থনীতিতে নির্মাণ, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আতিথেয়তা খাতের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বৃদ্ধি, অবসর গ্রহণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে অভিবাসীরা ভূমিকা রাখেন। তবে সব খাতে একই ধরনের কর্মীর চাহিদা নেই। কোথাও অভিজ্ঞ ও উচ্চদক্ষ কর্মী প্রয়োজন, আবার কোথাও প্রশিক্ষিত কারিগরি কর্মী বা সেবাকর্মীর চাহিদা রয়েছে।
এ কারণে কানাডায় অভিবাসনের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করতে হলে শুধু মোট জনসংখ্যার হিসাব নয়, কোন পেশায় কত কর্মী প্রয়োজন, তাঁদের যোগ্যতা কী এবং কোন অঞ্চলে চাকরির সুযোগ রয়েছে, সেসব বিষয়ও বিবেচনা করা জরুরি। কোনো দেশে শ্রমিকের চাহিদা থাকলেই সব বিদেশি নাগরিকের জন্য স্থায়ী বসবাস বা কাজের অনুমতি নিশ্চিত হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির যোগ্যতা, ভাষাগত দক্ষতা, শিক্ষাগত সনদ, কাজের অভিজ্ঞতা এবং প্রচলিত অভিবাসনবিধি পূরণ করতে হয়।
অন্যদিকে, অভিবাসন বাড়ানোর সঙ্গে আবাসন, চিকিৎসা, পরিবহন, শিক্ষা এবং অন্যান্য জনসেবার সক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। কানাডা সরকার তার সাম্প্রতিক পরিকল্পনায় অভিবাসনের মাত্রাকে টেকসই পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছে। একই সঙ্গে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দক্ষ কর্মী আকর্ষণ এবং শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা স্থিতিশীল করাও পরিকল্পনার অংশ।
ভারত ও কানাডার মধ্যে অভিবাসন এবং শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা দুই দেশের নাগরিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভারতীয় শিক্ষার্থী, দক্ষ কর্মী ও পেশাজীবীরা কানাডায় পড়াশোনা এবং কাজের সুযোগ খোঁজেন। তবে কোনো কূটনীতিকের বক্তব্যের ভিত্তিতে নতুন অভিবাসন কর্মসূচি চালু হয়েছে, বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কিংবা ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে দেড় কোটি মানুষের মতো বড় একটি সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে মূল সাক্ষাৎকার, সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও, সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের বিবৃতি কিংবা নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থাকা জরুরি। বক্তব্যটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি শ্রমবাজারের পূর্বাভাস, জনসংখ্যাগত হিসাব, নাকি সরকারের নির্ধারিত অভিবাসন লক্ষ্য সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। এসব তথ্য ছাড়া সংখ্যাটিকে কানাডার সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
কানাডার সরকারি পরিকল্পনা থেকে আপাতত যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো দেশটি একদিকে অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ কর্মী আকর্ষণ করতে চায়, অন্যদিকে আবাসন ও জনসেবার ওপর চাপ বিবেচনায় অভিবাসনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তাই আগামী দশকে দেড় কোটি নতুন অভিবাসী গ্রহণের দাবি এখনো যাচাই-অপেক্ষমাণ। সংশ্লিষ্ট হাইকমিশনারের মূল বক্তব্য বা কানাডা সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া গেলে দাবিটির সত্যতা আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।





