নিউইয়র্কে কলম্বাস দিবসের শোভাযাত্রায় দুয়োধ্বনি, সমালোচনায় গভর্নর ও মেয়র
নিউইয়র্কের ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রায় গভর্নর ক্যাথি হোকুলকে দুয়োধ্বনির মুখে পড়তে হয়েছে, আর মেয়র জোহরান মামদানির অনুপস্থিতি ঘিরে ইতালীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ঐতিহ্যবাহী কলম্বাস দিবসের শোভাযাত্রায় দর্শকদের একাংশের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুল। একই অনুষ্ঠানে শহরের মেয়র জোহরান মামদানির অনুপস্থিতি ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইতালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের ঐতিহ্য ও অবদান উদ্যাপনের এই আয়োজনে দুই নেতার অবস্থান নিয়ে আলোচনা এখন নিউইয়র্কের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ শোভাযাত্রাটি ছিল নিউইয়র্কের ৮২তম বার্ষিক কলম্বাস দিবসের আয়োজন। পঞ্চম সড়ক ধরে ম্যানহাটনের ৪৪তম সড়ক থেকে ৭২তম সড়ক পর্যন্ত শোভাযাত্রা এগিয়ে যায়। এতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাদ্যযন্ত্রের দল, সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অংশ নেন। আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল ইতালীয় ও ইতালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং যুক্তরাষ্ট্র গঠনে তাঁদের অবদান তুলে ধরা।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার সময় গভর্নর হোকুলকে দর্শকদের একাংশ দুয়োধ্বনি দেন এবং কেউ কেউ তাঁকে লক্ষ্য করে কটূক্তি করেন। কিছু দর্শক হাতের আঙুল দিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কয়েকজন প্রতিবাদকারী তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে শোভাযাত্রায় উপস্থিত সবাই যে গভর্নরের বিরোধিতা করেছেন, এমন কোনো প্রমাণ নেই। তাই কয়েকজনের প্রতিবাদকে পুরো নিউইয়র্কবাসী কিংবা গোটা ইতালীয় বংশোদ্ভূত সম্প্রদায়ের মতামত হিসেবে তুলে ধরা যথাযথ হবে না।
গভর্নর হোকুলের অংশগ্রহণের বিপরীতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে মেয়র মামদানির অনুপস্থিতি। তিনি এবারের শোভাযাত্রায় অংশ নেননি। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা এবং ইতালীয় বংশোদ্ভূত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, অনুষ্ঠানটি শুধু ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে স্মরণ করার জন্য নয়; এটি নিউইয়র্কের ইতালীয় বংশোদ্ভূত মানুষের পরিচয়, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক অবদান উদ্যাপনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
তবে মেয়রের অনুপস্থিতিকে ইতালীয় সম্প্রদায়ের প্রতি অসম্মান হিসেবে দেখার সঙ্গে একমত নন সবাই। কলম্বাসের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। একদিকে অনেক ইতালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক তাঁকে নিজেদের ঐতিহাসিক পরিচয় ও পূর্বপুরুষদের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেন। অন্যদিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের প্রভাব, সহিংসতা এবং শোষণের ইতিহাসের কারণে অনেকে তাঁকে উদ্যাপনের বিরোধিতা করেন। এই মতপার্থক্যই প্রতিবছর দিবসটি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
মামদানি ইতালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের ইতিহাস সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন এমন দাবি যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি ইতালীয় অভিবাসীদের সংগ্রাম, বৈষম্যের অভিজ্ঞতা এবং নিউইয়র্কের উন্নয়নে তাঁদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। ভিডিওতে তিনি ইতালীয় ঐতিহ্য উদ্যাপনের মাস উপলক্ষে শুভেচ্ছাও জানান। তবে তিনি কলম্বাস দিবসের শোভাযাত্রায় অংশ নেননি।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, মেয়র তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রায় অংশ না নেওয়ার কথা আগেই জানিয়েছিলেন। ফলে কলম্বাস দিবসের অনুষ্ঠান থেকে তাঁর দূরে থাকার সিদ্ধান্তকে কেউ নীতিগত অবস্থান হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ শহরের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভুল পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
এবারের শোভাযাত্রায় রিপাবলিকান দলের গভর্নর পদপ্রার্থী ব্রুস ব্লেকম্যানও উপস্থিত ছিলেন। তিনি হোকুলের শাসনব্যবস্থা এবং মামদানির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যে জীবনযাত্রার ব্যয়, কর, জননিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহির বিষয়গুলো উঠে আসে। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের আগে এই আয়োজন তাই সাংস্কৃতিক উদ্যাপনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শোভাযাত্রাটির এবারের মূল ভাবনা ছিল দুটি পতাকা, একটি আবাসভূমি। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন ২৫০ বছর পূর্তি এবং ইতালীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মার্কিন পরিচয়ের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আয়োজনে অংশ নেওয়া বহু মানুষ তাঁদের পরিবারের ইতিহাস, পূর্বপুরুষদের অভিবাসন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বক্তব্যে দর্শকদের হাতে মেয়রকে বরখাস্ত করার দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড এবং তাঁকে কারাগারে পাঠানোর মতো বক্তব্য শোনা যাওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে এসব নির্দিষ্ট প্ল্যাকার্ড ও বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
নিউইয়র্কের এই শোভাযাত্রা আবারও দেখিয়েছে যে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা, অভিবাসী সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করা এবং বর্তমান রাজনৈতিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কতটা জটিল। হোকুলের প্রতি দর্শকদের একাংশের অসন্তোষ এবং মামদানির অনুপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক দুটিই রাজনৈতিক আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে। তবে কয়েকজনের প্রতিবাদ কিংবা কোনো নেতার একটি অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতি দিয়ে পুরো সম্প্রদায়ের মনোভাব নির্ধারণ করা যায় না।





