রাশিয়ার ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্তে অনড় ট্রাম্প, ইউরোপের জ্বালানি কেনার যুক্তি তুলে বাড়ছে রাজনৈতিক বিতর্ক
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্তকে সঠিক বললেন ট্রাম্প। জ্বালানির দাম কমানোর যুক্তিতে তাঁর অবস্থানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বাড়ছে সমালোচনা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। দেশের জনগণের স্বার্থে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অতীতেও রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল অর্থের জ্বালানি কিনেছে বলে যুক্তি তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গন, ইউক্রেন এবং ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে নতুন করে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
১২ অক্টোবর প্রকাশিত এবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়াকে জ্বালানির জন্য ২৫ হাজার কোটি ডলার দিয়েছে। এরপর তিনি বলেন, মার্কিন জনগণের জন্য তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখছেন। তবে তাঁর উল্লেখ করা অর্থের হিসাবটি কোন সময়কালকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। জ্বালানি আমদানির বিভিন্ন স্বাধীন হিসাবের সঙ্গে এই অঙ্কের মোটামুটি মিল পাওয়া গেলেও নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়া দাবিটির পূর্ণ অর্থ বোঝা কঠিন।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের উচ্চমূল্য। কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন, ভারী যানবাহন পরিচালনা এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ডিজেল গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কৃষক, পরিবহন ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয়ও বাড়ে। পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি পেলে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামেও চাপ তৈরি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত ডিজেল এনে সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারের ওপর চাপ কমাতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। গত ৯ অক্টোবর ট্রাম্প জানান, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর রাশিয়া অবিলম্বে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করবে। পরবর্তী সময়ে আরও জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নভেম্বরে অতিরিক্ত পাঁচ লাখ টন এবং এরপর আরও এক লাখ নয়, বরং প্রাথমিক ঘোষণায় দশ লাখ টন সরবরাহের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। ভবিষ্যৎ সরবরাহের পরিমাণ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর অবস্থার ওপর।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য রুশ জ্বালানির ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সাময়িক শিথিলতা আনা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্র আগে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার আয় সীমিত করা, যাতে দেশটির সামরিক অভিযান পরিচালনার আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়। এখন সেই নীতিতে শিথিলতা আনার ফলে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতা মনে করছেন, রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার অনুমতি দেওয়া হলে মস্কো নতুন আয়ের সুযোগ পাবে। তাঁদের আশঙ্কা, এই অর্থ ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের ব্যয় বহনে সহায়তা করতে পারে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের কয়েকজন সিনেটর সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার সময় দেশটির জ্বালানি আয়ের সুযোগ বাড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনি প্রশ্ন। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রুশ জ্বালানি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। ওই আইনে নির্দিষ্ট শর্তে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকলেও তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও ব্যাখ্যা নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, বর্তমান সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছে কি না এবং আইনগত শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার করা জরুরি। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রাসঙ্গিক আইন ও সরকারি ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির সুযোগ বাড়লে দেশটি আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ইউক্রেনের দৃষ্টিতে, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে কিয়েভ দুর্বল বার্তা হিসেবে দেখছে।
ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে শিথিলতা আনলেও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞানীতি অব্যাহত থাকবে। তাঁদের যুক্তি, যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের নিরাপত্তা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় জ্বালানি নিয়ে এই মতপার্থক্য দুই পক্ষের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমর্থকেরাও রয়েছেন। তাঁদের মতে, জ্বালানির দাম কমানো এবং কৃষক ও পরিবহন খাতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দ্রুত সরবরাহ বাড়ানো গেলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই যুক্তিতে তাঁরা রাশিয়া থেকে জ্বালানি আনার উদ্যোগকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের সংশয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক ডিজেলের চাহিদার তুলনায় ঘোষিত প্রাথমিক সরবরাহ সীমিত। ফলে এই চালান একাই বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত। রাশিয়ার শোধনাগারের ক্ষয়ক্ষতি, জাহাজের প্রাপ্যতা, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যান্য সমস্যাও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা মনে করছেন, এতে রাশিয়ার আর্থিক সুবিধা বাড়তে পারে এবং ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার মার্কিন নীতিতে অসংগতি তৈরি হতে পারে। সরবরাহ বাস্তবে কতটা বাড়ে, জ্বালানির দাম কতটা কমে এবং নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আইনি বিতর্ক কোন দিকে যায় এসব বিষয়ই আগামী দিনগুলোতে এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করবে।





