দায়িত্ব পালনকালে গুলিতে নিহত ফিলাডেলফিয়ার পুলিশ কর্মকর্তা, আহত আরেকজন, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় অস্ত্রধারীর গুলিতে এক পুলিশ কর্মকর্তা নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন; সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়া শহরে অস্ত্রধারী এক ব্যক্তির গুলিতে শন সাইবার নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন। শনিবার, ১০ অক্টোবর ভোরে পশ্চিম ফিলাডেলফিয়ায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, অস্ত্রধারী ব্যক্তির উপস্থিতির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর কর্মকর্তারা গুলির মুখে পড়েন। এ ঘটনায় ৩৫ বছর বয়সী এরিক লুইস নামের এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিহত শন সাইবারের বয়স ছিল ৪০ বছর। তিনি ফিলাডেলফিয়া পুলিশ বিভাগে প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ করছিলেন। কর্মজীবনে তিনি নগরীর বাসিন্দাদের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার, সহকর্মী ও নগরীর পুলিশ বিভাগে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পুলিশ বিভাগের কমিশনার কেভিন বেথেল জানিয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাইবারের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা তাঁর পাশে ছিলেন। চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত কর্মকর্তা দুই সন্তানের জনক ছিলেন। তাঁর সাত বছর বয়সী একটি ছেলে এবং তিন বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। পরিবারের এই আকস্মিক ক্ষতি নগরীর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার রাত পেরিয়ে ভোররাতে। স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১২টা ২০ মিনিটে পশ্চিম ফিলাডেলফিয়ার নর্থ ফিফটি-সেকেন্ড স্ট্রিটের একটি বাড়ির সামনের বারান্দায় অস্ত্রধারী একজন ব্যক্তির উপস্থিতির খবর পায় পুলিশ। খবরের ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যদের সেখানে পাঠানো হয়। কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাড়িটির কাছে এগিয়ে গেলে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর কর্মকর্তারা ব্যাপক গুলিবর্ষণের মুখে পড়েন। এতে সাইবারসহ দুই কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হন। সাইবারের শরীরে তিনটি গুলি লাগে। অন্য কর্মকর্তার শরীরে ১২টি গুলি লাগে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। দুজনকেই দ্রুত পেন প্রেসব্যাটেরিয়ান চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং তাঁদের অস্ত্রোপচার করা হয়।
চিকিৎসার পর আহত দ্বিতীয় কর্মকর্তার অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়। তবে পুলিশ কমিশনার সতর্ক করে বলেছেন, তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এখনো ঝুঁকি রয়েছে। ওই কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। তাঁর বয়স ৩৩ বছর এবং তিনি পাঁচ সন্তানের বাবা বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গুলিবর্ষণের পর সন্দেহভাজন ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে তিনি আশপাশের একটি গলির দিকে যান এবং সেখানে অবস্থানকালে অন্য পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করেও গুলি চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়। দীর্ঘ তল্লাশির পর সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে একটি গাছে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় খুঁজে পেয়ে আটক করা হয়।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম এরিক লুইস এবং তাঁর বয়স ৩৫ বছর। নগরীর সরকারি পানি সরবরাহ বিভাগে তিনি কাজ করতেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এবং অস্ত্রসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থলে পৌঁছানো আরও নয়জন পুলিশ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ওই নয়জন কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হননি।
আদালতের নথি ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন ছাড়াই আটক রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান। অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এমন দাবি করা যাবে না। আদালতে প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপনের পরই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি হবে।
ঘটনাস্থল থেকে দুটি হাতবন্দুক ও একটি ছররা বন্দুক উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। উদ্ধার করা হাতবন্দুকগুলোর একটি গুলিবিদ্ধ কর্মকর্তাদের একজনের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। অস্ত্রগুলো কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং পুরো ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির ভূমিকা কী ছিল, তা তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো নিহত কর্মকর্তার স্মরণে অঙ্গরাজ্যজুড়ে সরকারি ভবনে জাতীয় ও অঙ্গরাজ্যের পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দেন। তিনি নিহত কর্মকর্তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহত কর্মকর্তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। ফিলাডেলফিয়ার মেয়র শেরেল পার্কারও নিহতের পরিবার ও পুলিশ বিভাগের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
এ ঘটনায় নগরীর জননিরাপত্তা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ঘটনার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি। তদন্তকারীরা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, উদ্ধার করা অস্ত্র এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করছেন।
ফিলাডেলফিয়ার এ গুলির ঘটনা নগরীর পুলিশ বিভাগ ও নিহত কর্মকর্তার পরিবারের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি। একজন অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু এবং আরেকজনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় শহরজুড়ে শোক বিরাজ করছে। তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার আরও তথ্য প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।




