গাজায় ইসরায়েলি হামলায় পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত, যুদ্ধবিরতি ঘিরে নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও নতুন হামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং পুনর্গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর পৃথক হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শনিবার, ১০ অক্টোবর গাজা নগরীর দুটি এলাকায় এসব হামলার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন গাজা নগরীর পান্ডা মলের কাছে এবং একজন তুফাহ এলাকায় প্রাণ হারান। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলা দুটির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র যোদ্ধারা। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার পর স্থানীয় চিকিৎসাকর্মীরা হতাহতদের বিষয়ে তথ্য দেন। তবে নিহতদের সবার পরিচয়, বয়স এবং তাঁদের মধ্যে কোনো বেসামরিক নাগরিক ছিলেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। ফলে হতাহতদের পরিচয় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্যের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পরবর্তী বিবৃতির অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
গত এক বছরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজায় প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা বন্ধ হয়নি। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, হামাস যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে এবং হামলার পরিকল্পনা করছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বাড়ানো হয়েছে বলে ইসরায়েল জানিয়েছে।
অন্যদিকে, হামাস অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠন কিংবা নতুন হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির অভিযোগ, ইসরায়েলি হামলা ও সামরিক তৎপরতা যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। ফলে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর রয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায় কার্যকর হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল বড় ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করা, জিম্মি ও বন্দিদের মুক্তির ব্যবস্থা করা, মানবিক সহায়তা বাড়ানো এবং পরবর্তী সময়ে গাজার পুনর্গঠনের পথ তৈরি করা। তবে যুদ্ধবিরতির এক বছর পরও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতি সীমিত।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ও হামলায় অন্তত এক হাজার চারশ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েল জানিয়েছে, একই সময়ে গাজায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় তাদের চার সেনা নিহত হয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে; সব তথ্যের স্বাধীন যাচাই সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু নিরাপত্তা সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সংঘাতে বহু আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, সড়ক, পানি সরবরাহব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও তাঁবুতে বসবাস করছেন। শীত ও বৃষ্টির মৌসুম ঘনিয়ে আসায় আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা এবং খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, গাজার বিপুলসংখ্যক মানুষের জরুরি আশ্রয় সহায়তা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত তাঁবু, দুর্বল নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাসের কারণে ভারী বৃষ্টিতে বন্যা ও অন্যান্য বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন হামলা হলে উদ্ধারকাজ, ত্রাণ বিতরণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত হতে পারে।
যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে গাজার পুনর্গঠন, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামাসের অস্ত্র ত্যাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু এসব বিষয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত থাকায় আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে না। ইসরায়েল বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ জরুরি। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি পক্ষ ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও হামলা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
১০ অক্টোবরের হামলার পর নতুন করে উত্তেজনা বাড়লেও পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মহলের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে দুই পক্ষকে কার্যকর আলোচনায় ফিরিয়ে আনা।
গাজায় নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও গভীর হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান, নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি কঠিন হয়ে পড়বে।




