ইরানকে অর্থ সহায়তার অভিযোগে কানাডার আট প্রতিষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা
যুক্তরাষ্ট্র ৬ নভেম্বর ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের অভিযোগে কানাডার আটটি মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে, বাড়িয়েছে তেহরানের আর্থিক চাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে কানাডার আটটি অর্থ স্থানান্তর ও মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান। ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে লেনদেন পরিচালনায় সহায়তা এবং দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে ওয়াশিংটন। গত ৬ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কানাডার অন্টারিও ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অঞ্চলে পরিচালিত আটটি অর্থসেবা প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনে ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান ইরানি মুদ্রা রিয়ালসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা বিনিময় করে সেগুলোকে ডিজিটাল সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরে সহায়তা করেছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাইভার্স ট্রেড ইনকরপোরেটেড, যা মিলিয়ন এক্সচেঞ্জ নামে পরিচিত। রয়েছে ১৩৮০০৭৯ বিসি লিমিটেড, টপ পিসি টেকনিশিয়ান ইনকরপোরেটেড, এনআইএ নেশনস কারেন্সি লিমিটেড, ২৩৯৭৬৩৯ অন্টারিও লিমিটেড, যা ফারাহ এক্সচেঞ্জ নামে পরিচিত। এ ছাড়া সিসিসি ইনকরপোরেটেড, বি গ্যালাক্সি ইনকরপোরেটেড এবং দারবিশ এক্সচেঞ্জও এই তালিকায় রয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটির সঙ্গে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ডিজিটাল মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল সম্পদের ঠিকানার লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই ধরনের আর্থিক কার্যক্রম ইরানের জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করছে।
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শুধু প্রচলিত অর্থ বিনিময় নয়, ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান ক্রমেই ডিজিটাল মুদ্রা ও বিকল্প অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। নগদ অর্থকে ডিজিটাল সম্পদে রূপান্তর করে বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
নিষেধাজ্ঞার ফলে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ বা সম্পদের ওপর স্বার্থ অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, প্রতিষ্ঠান এবং দেশটির নিয়ন্ত্রণাধীন আর্থিক সংস্থাগুলোর জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অধিকাংশ ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ, মার্কিন ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর এবং মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধার মুখে পড়বে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। আন্তর্জাতিক ব্যাংক, অর্থ স্থানান্তরকারী প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল সম্পদ লেনদেনকারী সংস্থাগুলোও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক সীমিত করতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞার অর্থ এই নয় যে কানাডার সব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান একই ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।
এই পদক্ষেপের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কানাডার আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ফিনট্র্যাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক অপরাধবিষয়ক নজরদারি সংস্থা এবং কানাডার আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা ছিল। অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত লেনদেন শনাক্ত করতে দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের সরকার এবং তাদের সহযোগীদের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের অবৈধ আর্থিক লেনদেন পরিচালনায় সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের যেখানেই থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে, ইরানের আর্থিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ওয়াশিংটন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান নয়, বিদেশে অবস্থানকারী মধ্যস্থতাকারীদেরও লক্ষ্যবস্তু করছে।
এদিকে এই নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মাদক পাচারসংক্রান্ত আরেকটি অভিযোগও সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দাবি, তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কানাডার সাবেক অলিম্পিক স্নোবোর্ডার রায়ান ওয়েডিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ স্থানান্তরেও ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, মাদক ব্যবসা থেকে পাওয়া অর্থ নগদ আকারে সংগ্রহ করে ডিজিটাল সম্পদে রূপান্তর এবং বিদেশে পাঠানোর কাজে এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি ব্যবহৃত হয়েছে। রায়ান ওয়েডিংকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আটক করা হয় বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তবে এই অভিযোগগুলোকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া মানেই প্রতিটি অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগের বিষয়ে কোনো বিস্তারিত জবাব পাওয়া গেছে কি না, তা নিয়েও প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট তথ্য নেই।
একই দিনে ডিজিটাল মুদ্রা বিনিময়কারী প্রতিষ্ঠান মেক্সসি গ্লোবালের বিরুদ্ধেও আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অপরাধবিষয়ক সংস্থা। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি ইরান, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া এবং অন্যান্য নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্তত ১৬ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেন সহজ করেছে। এই আদেশের আওতায় মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মেক্সসি গ্লোবাল-সংশ্লিষ্ট অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়া করতে নিষেধ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই প্রতিষ্ঠান কানাডার নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা আটটি প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত নয়।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, কানাডার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা ইরানের আর্থিক যোগাযোগ সীমিত করার মার্কিন প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বিভিন্ন দেশের মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ থাকলে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা দুর্বল হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি ইরানের পাশাপাশি বিদেশে থাকা সম্ভাব্য আর্থিক মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছে।
কানাডার আটটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর অভিযোগ দুই দেশের আর্থিক নজরদারি ব্যবস্থার গুরুত্ব সামনে এনেছে। তবে এই ঘটনার পর কানাডার আর্থিক খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।