কাগজে জেট ফুয়েল আছে, বাস্তবে নেই: তিন ডিপোতে উধাও প্রায় এক লাখ লিটার জ্বালানি
পদ্মা অয়েলের তিন ডিপোতে প্রায় এক লাখ লিটার জেট ফুয়েলের হিসাব নেই, পাচারের অভিযোগে কর্মকর্তাসহ আটজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিমান চলাচলের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জ্বালানি জেট ফুয়েল। সেই জ্বালানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েলের ডিপো ঘিরেই গড়ে উঠেছে আত্মসাৎ ও পাচারের শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
কয়েক মাসের ব্যবধানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত তিনটি ঘটনায় প্রায় এক লাখ লিটার জেট ফুয়েলের কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
ঘটনাগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, খাতা-কলমে জ্বালানি সরবরাহ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ট্যাংকলরিই ডিপোতে প্রবেশ করেনি। পরিবহন, ডিপোতে প্রবেশের তথ্য সংরক্ষণ, পরিমাপ এবং গ্রহণসংক্রান্ত নথিপত্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে এখন গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
ইতোমধ্যে এসব ঘটনায় পদ্মা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দুই ডিপো ব্যবস্থাপককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগ।
কাগজে সরবরাহ, বাস্তবে অনুপস্থিত ট্যাংকলরি
সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ১১ মার্চ। ওই দিন পদ্মা অয়েলের নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর উদ্দেশে চারটি ট্যাংকলরিতে ৭২ হাজার লিটার জেট এ-১ জ্বালানি সরবরাহের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ডিপোর নিবন্ধন খাতায় সংশ্লিষ্ট গাড়িগুলোর প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় উল্লেখ রয়েছে। এমনকি জ্বালানি গ্রহণের কাগজপত্রেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। কিন্তু বাস্তবে ওই চারটি ট্যাংকলরি ডিপোতে প্রবেশই করেনি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, সরবরাহ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা নথিতে সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তব পরিবহন ও গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসংগতি ছিল। এই ঘটনায় ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েলের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাধারণত জেট ফুয়েল পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্যাংকলরির প্রতিটি চেম্বারের জ্বালানির পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়। গন্তব্যের ডিপোতে গাড়ি প্রবেশের তথ্য সংরক্ষণ, পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট এভিয়েশন ফুয়েল স্টক ট্রান্সফার অ্যাডভাইস নোট ও রিলিজ সার্টিফিকেটে স্বাক্ষরের মাধ্যমে জ্বালানি গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই ঘটনায় নথিপত্রের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির অসামঞ্জস্য তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, পাঁচজন সাময়িক বরখাস্ত
৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল আত্মসাতের অভিযোগে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক সাইদুল হকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জ্বালানির মূল্য ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পদ্মা অয়েল।
প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (মানবসম্পদ) মীর মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন জানিয়েছেন, তদন্তের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সাইদুল হক ছাড়াও ছমীর উদ্দিন, আকতার কামাল, শওকত হোসেন ও মানিক কুমার রায়কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামেও জ্বালানি গায়েবের অভিযোগ
ঢাকার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই চট্টগ্রামে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক জেট ফুয়েল সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। গত ১৮ মে সংঘটিত ঘটনায় ৯ হাজার লিটার জেট ফুয়েল পাচারের অভিযোগ ওঠে।
প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে পদ্মা অয়েলের শাহ আমানত বিমানবন্দরের ডিপো ইনচার্জ মো. সোহেল ইদ্রিস এবং প্রতিষ্ঠানটির গাড়িচালক মো. জসিম উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
পদ্মা অয়েলের মানবসম্পদ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মীর মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের ঘটনায় ডিপো ইনচার্জ সোহেল ইদ্রিসকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে জব্দ সাড়ে ১৬ হাজার লিটার জেট ফুয়েল
সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে জেট ফুয়েল পাচারের আরেকটি ঘটনা সামনে এসেছে। সেখানে সাড়ে ১৬ হাজার লিটার জেট ফুয়েল জব্দ করার সময় একটি চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় ট্যাংকলরির চালক সাগর হোসেন (২৭) গ্রেপ্তার হয়েছেন। পরে তাঁর সঙ্গে লরির হেলপার দ্বীন ইসলাম (৫২) এবং মালিক ইয়ার হোসেন ভূঁইয়াকে (৫০) আসামি করে মামলা করা হয়েছে। মামলায় আরও দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদ হোসেন গ্রেপ্তার ও মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
পরপর তিনটি ঘটনায় বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েলের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পদ্মা অয়েলের ডিপোভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, পরিবহন তদারকি এবং জ্বালানি গ্রহণের নথি যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ডিপোতে গাড়ি প্রবেশ না করেও কীভাবে নিবন্ধন খাতায় প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য যুক্ত হলো, কারা জ্বালানি গ্রহণের নথিতে স্বাক্ষর করলেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তদারকির ঘাটতি কোথায় ছিল, এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাব প্রয়োজন।
তিনটি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা জরুরি। অন্যথায় গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি খাতে একই ধরনের অনিয়ম পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।