ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারে উদ্বেগ, প্রতিরোধে সরকারি প্রস্তুতি ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
েশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, হাসপাতালে রোগীর চাপ তীব্র হচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যুও; মশা নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত চিকিৎসা এবং কার্যকর প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ এখন জরুরি।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। মশাবাহিত এই রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রস্তুতি, মশা নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা, হাসপাতালের চিকিৎসাসক্ষমতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অক্টোবর মাসেও রোগীর চাপ অব্যাহত থাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়, আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২ হাজার ২১৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে চলতি বছরের মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার ১৬৬ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৩৮৯ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৬ হাজার ৩৮৪ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৯৩ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন বলে জানানো হয়।
তবে সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উন্মুক্ত দৈনিক পরিসংখ্যানের পাতায় সর্বশেষ দৃশ্যমান হিসাব ছিল ২৫ অক্টোবরের। সেখানে চলতি বছরে মোট আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৪৮ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৩৮৪ দেখানো হয়েছে। ওই ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ২৪৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সাতজনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়। ফলে ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে প্রকাশিত নতুন হিসাব ও সরকারি ওয়েবপাতায় দৃশ্যমান হিসাবের মধ্যে সময়ের পার্থক্য রয়েছে। সর্বশেষ সংখ্যা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ দৈনিক বিজ্ঞপ্তি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট, ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ২৫ অক্টোবরের হিসাবেই এক দিনে ২ হাজার ২৪৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক সংখ্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর এক দিনে ২ হাজার ১৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা নতুন রেকর্ড গড়েছে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু রোগী ও মৃত্যুর হিসাব যথেষ্ট নয়। কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি, কোথায় মশার প্রজননস্থল রয়েছে, কোন হাসপাতালে শয্যা ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট দেখা দিচ্ছে এবং রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নিয়মিত তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রমের ফলাফল যাচাই করা গেলে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা শনাক্ত করা সহজ হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদের পানির ট্যাংক এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই শুধু রাস্তা বা নর্দমায় ওষুধ ছিটিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। জমে থাকা পানি অপসারণ, পাত্র পরিষ্কার রাখা, পানির ট্যাংক ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। যেসব এলাকায় রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছেন, সেখানে ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে। তবে এসব কার্যক্রম বাস্তবে কতটা পরিচালিত হচ্ছে এবং সেগুলোর ফলে মশার ঘনত্ব কমছে কি না, তা যাচাই করতে নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত প্রতিবেদন প্রয়োজন।
চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সব রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু রোগের জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে চিকিৎসাসেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি ও জরুরি ব্যবস্থাপনা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর কমে যাওয়ার পরও কখনো কখনো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে ডেঙ্গুর সন্দেহে এগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। জ্বরের জন্য উপযুক্ত ওষুধও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা উচিত।
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। জ্বর দেখা দিলে শুধু ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা রোগীর সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এককালীন অভিযান নয়, বরং সারা বছর ধরে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই প্রজননস্থল শনাক্ত করা, নিয়মিত মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সংক্রমণ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রোগীর সংখ্যা কমানো, মৃত্যুহার হ্রাস, চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এই চারটি ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে জনগণের সামনে প্রকাশ করা জরুরি, যাতে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি না থাকে। নাগরিকদের সচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।