ট্রাম্পের নির্বাচনী হস্তক্ষেপে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র, আলাস্কা-ক্যালিফোর্নিয়ায় বিচার বিভাগের পদক্ষেপে বাড়ছে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আলাস্কায় ফল অনুমোদন ঠেকানোর মামলা, ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাই নিয়ে বিচার বিভাগের পদক্ষেপে তীব্র হয়েছে বিতর্ক।
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নির্বাচনী ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আলাস্কায় সিনেট নির্বাচনের ফল অনুমোদন আটকে দেওয়ার আবেদন এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় হাজার হাজার ভোটারের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের দাবিতে বিচার বিভাগের তৎপরতা রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, নির্বাচনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় অঙ্গরাজ্যগুলোর কর্তৃত্ব থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার কত দূর পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে পারে?
সাম্প্রতিক কয়েকটি পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের বক্তব্য, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনে অননুমোদিত ভোট ঠেকানো তাদের আইনগত দায়িত্ব। অন্যদিকে অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা বলছেন, যাচাই না করা তথ্যের ভিত্তিতে ভোট স্থগিত রাখা কিংবা নির্বাচনের ফল অনুমোদন বাধাগ্রস্ত করার উদ্যোগ বৈধ ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারেন।
আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের পুনর্নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন একই ধরনের নামের আরেক প্রার্থী ড্যানিয়েল জে সুলিভান জুনিয়র। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলা। একই নামের আরেক প্রার্থী ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারেন এমন যুক্তি তুলে ধরে বিচার বিভাগ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
২৩ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বিচার বিভাগ আদালতের কাছে এমন নির্দেশ চেয়েছে, যাতে রিপাবলিকান সিনেটর পরাজিত হলে এবং অন্য প্রার্থীর ভোটসংখ্যা ফলাফলের ব্যবধানকে প্রভাবিত করার মতো হলে নির্বাচনের ফল অনুমোদন স্থগিত রাখা যায়। এরপর ভোটাররা কাকে ভোট দিতে চেয়েছিলেন, তা তদন্তের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও মামলায় রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি নিজেই এই মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে একই নামের দুই প্রার্থীর উপস্থিতি নির্বাচনের ফলকে বাস্তবে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
আলাস্কার নির্বাচনী কর্মকর্তারা আগে দ্বিতীয় প্রার্থীকে ব্যালট থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অঙ্গরাজ্যের আদালত তাঁকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয় এবং অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। ব্যালটে দুই প্রার্থীর নামের পাশাপাশি তাঁদের পরিচয় ও দলীয় অবস্থান আলাদাভাবে উল্লেখ থাকার বিষয়টিও বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার নির্বাচনী শিবির এবং ডেমোক্র্যাটদের সংশ্লিষ্ট একটি জাতীয় নির্বাচনী সংগঠন বিচার বিভাগের মামলায় অংশ নিয়ে সেটি খারিজের আবেদন করেছে। তাঁদের যুক্তি, প্রার্থীদের ব্যালটে রাখার সিদ্ধান্ত এবং ভোট গণনার নিয়ম নির্ধারণে অঙ্গরাজ্যের কর্তৃত্ব রয়েছে। নির্বাচনের ফল আগাম আটকে দেওয়ার মতো প্রতিকার চাওয়ার আইনগত ভিত্তিও তাঁরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ায় বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ভোটার তালিকায় থাকা বিশ হাজারের বেশি মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে বিচার বিভাগের দাবি। ১৫ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকার অঙ্গরাজ্যটির বিরুদ্ধে মামলা করে। সরকারের অভিযোগ, তালিকায় এমন ব্যক্তিরা রয়েছেন, যাঁরা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন, অথচ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচনে নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের ভোট দেওয়া বেআইনি। তবে কারও নাম ভোটার তালিকায় থাকা কিংবা কোনো সরকারি তথ্যভান্ডারে অসংগতি পাওয়া মানেই তিনি বেআইনিভাবে ভোট দিয়েছেন এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব এবং ভোট দেওয়ার যোগ্যতা যাচাই করতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
বিচার বিভাগ আদালতের কাছে সন্দেহভাজন ভোটারদের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট আলাদা রাখা এবং নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোর গণনা স্থগিত রাখার নির্দেশ চেয়েছে। এদিকে ২৩ অক্টোবরের দিকে আদালত থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত না পাওয়ার পর বিচার বিভাগ আপিল আদালতের হস্তক্ষেপও চেয়েছে। ফলে মামলাটি শুধু ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নয়, নির্বাচনের সময় আদালতের ক্ষমতা এবং অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সীমা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
২৪ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়ার ৫৮টি কাউন্টির কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সন্দেহভাজন ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ে সহযোগিতা চেয়েছে। চিঠিগুলোতে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা না গেলে সংশ্লিষ্ট ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট আলাদা রাখার কথা বলা হয়েছে। কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে, বেআইনি ভোট গণনায় জেনেশুনে সহায়তা করলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, পর্যাপ্ত যাচাইযোগ্য তথ্য ছাড়া এত অল্প সময়ের মধ্যে ভোটারদের নাগরিকত্ব পরীক্ষা করা হলে বৈধ নাগরিকদের ভোটও সন্দেহের আওতায় পড়তে পারে। অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভোটার নিবন্ধন, ব্যালট পরিচালনা, ভোট গণনা এবং ফল অনুমোদনের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব আইন ও বিধি রয়েছে। অন্যদিকে ফেডারেল সরকার জাতীয় নির্বাচনের প্রযোজ্য আইন কার্যকর করা এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। বিরোধের মূল প্রশ্ন হলো, এই ক্ষমতার সীমা কোথায় এবং কোন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী সিদ্ধান্তে আদালতের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ আলাস্কার মামলায় বিচার বিভাগের যুক্তিকে দুর্বল বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মতে, একই ধরনের নামের প্রার্থী থাকলেই ভোটাররা বিভ্রান্ত হয়েছেন কিংবা নির্বাচনের ফল অবৈধ হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি হয় না। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্ষেত্রেও সন্দেহভাজন ভোটারের তালিকা এবং নাগরিকত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
তবে প্রশাসনের যুক্তি, নির্বাচনে নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সরকারের বক্তব্য, ভোটের বৈধতা নিশ্চিত করা এবং যোগ্য নাগরিকদের ভোটের মূল্য রক্ষা করাই এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। এই যুক্তির বিপরীতে সমালোচকেরা বলছেন, যাচাইয়ের নামে বৈধ ভোটারদের ব্যালট আটকে দেওয়া হলে নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় আলাস্কা ও ক্যালিফোর্নিয়ার বিরোধ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সিনেটের আসনসংখ্যা কাছাকাছি হলে আলাস্কার একটি আসনের ফল জাতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন পর্যন্ত এসব মামলায় বিচার বিভাগের দাবিগুলোকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না। অভিযোগ, প্রাথমিক তথ্য এবং আদালতে প্রমাণিত সত্য এক বিষয় নয়। একইভাবে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের দাবি উঠলেই সংশ্লিষ্ট সবাই অনিয়ম করেছেন বলে ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না।
আগামী দিনগুলোতে আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়, অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা কীভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের দাবির জবাব দেন এবং ভোটারদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকে সেদিকেই নজর থাকবে। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈধ ভোট গণনা ও ফল অনুমোদনের প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।





