অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
পুরোনো বিরোধ পেছনে ফেলে মিশিগানে এল-সাইয়েদের পাশে ওবামা, ভোটের মাঠে নতুন উত্তাপ
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের পক্ষে প্রচারে নামলেন বারাক ওবামা; কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন ও পুরোনো সমালোচনা ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক আলোচনা।
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য মিশিগানের সিনেট নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের যৌথ নির্বাচনী প্রচারকে কেন্দ্র করে। ২৪ অক্টোবর ডেট্রয়েট শহরে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে এল-সাইয়েদের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন ওবামা। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই উপস্থিতিকে ডেমোক্র্যাটদের ভোটারদের সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ওবামার সমর্থন এল-সাইয়েদের নির্বাচনী অবস্থান কতটা শক্তিশালী করবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
মিশিগান যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি অঙ্গরাজ্য, যেখানে নির্বাচনী ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যটির সিনেট আসন ঘিরে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সাইয়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান দলের সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্স। এই আসনের ফলাফল সিনেটে দলীয় শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে দুই দলের নেতারাই শেষ মুহূর্তে ভোটারদের সমর্থন নিশ্চিত করতে সক্রিয় হয়েছেন।
সমাবেশে ওবামা এল-সাইয়েদের প্রতি সমর্থন জানানোর পাশাপাশি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিভিন্ন নীতিরও সমালোচনা করেন। জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ, কানাডার ওপর আরোপিত শুল্ক এবং প্রশাসনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ওবামা ভোটারদের এমন প্রার্থী নির্বাচনের আহ্বান জানান, যাঁরা মানুষের সমস্যা বুঝতে পারেন এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন।
এল-সাইয়েদের প্রচারে ওবামার অংশগ্রহণের পেছনে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিশিগানের ডেট্রয়েটসহ কয়েকটি এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এবারের নির্বাচনে এল-সাইয়েদ এই ভোটারদের কতটা সমর্থন পাবেন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। একটি জরিপের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানিয়েছে, কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে এল-সাইয়েদের প্রতি সমর্থন ছিল ৭৭ শতাংশ। তবে জরিপের পদ্ধতি, নমুনার আকার এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনা না করে এই সংখ্যাকে পুরো ভোটারগোষ্ঠীর চূড়ান্ত মনোভাব হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ডেট্রয়েটে এক ডজনের বেশি কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে ফক্স নিউজ ডিজিটাল জানতে পেরেছে, ওবামার সমর্থন নিয়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া একরকম নয়। কেউ এল-সাইয়েদের প্রতি আগে থেকেই সমর্থন জানিয়েছেন, আবার কেউ এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। অনিশ্চিত ভোটারদের কয়েকজন বলেছেন, ওবামার সমর্থন তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁদের কাছে প্রার্থীর কাজ, নীতি এবং নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো জনপ্রিয় নেতার সমর্থন দেখে প্রার্থী বেছে নেওয়ার পরিবর্তে তাঁরা নিজেদের বিবেচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চান।
এই প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে বোঝা যায়, ওবামার জনপ্রিয়তা থাকলেও তাঁর সমর্থন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যেক ভোটারের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচনের সময় পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সমর্থন প্রচারে গতি আনতে পারে, সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ বাড়াতে পারে এবং সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং প্রার্থীর প্রতি আস্থাও নির্বাচনী সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।
এই প্রচারকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হলো ওবামার প্রেসিডেন্সি নিয়ে এল-সাইয়েদের অতীত সমালোচনা। ২০১২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওবামার পুনর্নির্বাচনের পর এল-সাইয়েদ একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে তাঁর প্রশাসনের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সেই লেখায় তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ওবামা নির্বাচনী প্রচারে পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পূরণে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করতে পারেননি। যুদ্ধনীতি, নাগরিক স্বাধীনতা, অভিবাসন থেকে বহিষ্কার এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মতো বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তবে সেই সমালোচনার পর ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এল-সাইয়েদ বলেন, তখন তিনি তুলনামূলকভাবে তরুণ ছিলেন এবং পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন। সময়ের সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেছেন, পরিবর্তন আনা কতটা কঠিন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে কাজ এগিয়ে নেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ওবামার কাজের প্রশংসাও করেছেন। ফলে অতীতের মতপার্থক্য সত্ত্বেও এখন দুজনের একই নির্বাচনী মঞ্চে উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন বাড়ানোর রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকেই এল-সাইয়েদ ওবামার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখাচ্ছেন। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, অতীতে কোনো নেতার নীতির সমালোচনা করা এবং পরে তাঁর সঙ্গে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা পরস্পরবিরোধী নয়। রাজনীতিতে মতামত ও অগ্রাধিকার সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কেবল পুরোনো লেখার ভিত্তিতে বর্তমান সম্পর্কের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
এল-সাইয়েদ ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে দলের মনোনয়ন পান। ওই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী অংশের মধ্যে মতপার্থক্যও সামনে এনেছিল। এখন তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করা এবং সাধারণ নির্বাচনে পর্যাপ্ত ভোট নিশ্চিত করা। ওবামার সমর্থন এই প্রচেষ্টায় সহায়ক হতে পারে, তবে নির্বাচনী ফল নির্ধারণ করবে ভোটারদের প্রকৃত সমর্থন।
সব মিলিয়ে, ডেট্রয়েটের সমাবেশ এল-সাইয়েদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রচারপর্ব হলেও এটিকে নির্বাচনে জয়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের প্রতিক্রিয়া, অর্থনৈতিক ইস্যু, রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের অবস্থান এবং শেষ মুহূর্তের প্রচার সবকিছুই ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। ওবামার উপস্থিতি ডেমোক্র্যাটদের প্রচারে নতুন গতি আনতে পারে, কিন্তু ভোটারদের আস্থা অর্জনের পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত এল-সাইয়েদকে নিজের অবস্থান ও কর্মসূচির ভিত্তিতেই উত্তীর্ণ হতে হবে।

ইউক্রেনের স্টারলিংক সচল, ড্রোন হামলার অভিযোগে ইলন মাস্কের সঙ্গে নতুন বিতর্কে ওয়াশিংটন

ভোট দিতে যাতায়াতে এক টাকাও নয়, নির্বাচনের দিন হিউস্টনে বিনা ভাড়ায় বাস-রেল

ট্রাম্পের রসিকতায় হাসির ঝড়, জেসন অ্যালডিয়ানের স্ত্রীকে নিয়ে মন্তব্য ঘিরে তুমুল আলোচনা




