মার্কিন নির্বাচনে কানাডার হস্তক্ষেপের অভিযোগ, কার্নির কড়া জবাবে বাড়ছে উত্তেজনা
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সুবিধা করে দিতে কানাডার কর্মকর্তারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এমন অভিযোগ ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এসব দাবির কোনো ভিত্তি নেই। গত শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, তুরস্ক সফরকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্যে হতাশা প্রকাশ করেন। বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
মার্কিন নির্বাচনের আগে এই অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন শুল্ক আরোপ, বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়া এবং কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের কারণে ওয়াশিংটন ও অটোয়ার সম্পর্ক আগে থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে।
গত বুধবার, ২১ অক্টোবর, কানাডায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস একটি তথ্যপত্র প্রকাশ করে। এতে কানাডার কয়েকজন রাজনীতিকের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরে দাবি করা হয়, তাঁরা মার্কিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আসন্ন নির্বাচনের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
দূতাবাসের বক্তব্য অনুযায়ী, কানাডার মন্ত্রী ও প্রাদেশিক নেতারা বিভিন্ন সরকারি নথি এবং প্রকাশ্য বক্তব্যে মার্কিন রাজনীতিকে প্রভাবিত করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তবে দূতাবাসের উপস্থাপিত উদাহরণগুলোকে নির্বাচনের ফল পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোনো সমন্বিত সরকারি কার্যক্রমের প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
এ ঘটনায় কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি এবং অন্টারিওর প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী ডগ ফোর্ডের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডকে মার্কিন প্রশাসন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
মার্কিন দূতাবাসের অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কানাডার পাল্টা শুল্ক আরোপের আলোচনা নিয়ে। কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কথা বলেছিলেন। মার্কিন দূতাবাস এসব বক্তব্যকে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
অন্যদিকে, অন্টারিওর মুখ্যমন্ত্রী ডগ ফোর্ডের উদ্যোগে প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। বিজ্ঞাপনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের বক্তব্যের অংশ ব্যবহার করে শুল্কনীতির সমালোচনা করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ব সিরিজের খেলা চলাকালে বিজ্ঞাপনটি প্রচারিত হওয়ার পর ট্রাম্প কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ করে দেন।
তবে কোনো দেশের শুল্কনীতি নিয়ে সমালোচনা করা কিংবা পাল্টা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ঘোষণার বিষয়টি নিজে থেকেই নির্বাচনে অবৈধ হস্তক্ষেপের প্রমাণ নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হলে বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের নির্দিষ্ট প্রমাণ বিবেচনা করা প্রয়োজন ।
মার্ক কার্নি বলেছেন, তাঁর সরকার যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তিনি আরও জানান, কানাডার কূটনীতিকদের এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে, যাতে তাঁদের কর্মকাণ্ডকে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি হয়।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হোয়েকস্ট্রার ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কার্নি। তাঁর মতে, একজন রাষ্ট্রদূতের এ ধরনের অভিযোগ তোলা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য সহায়ক নয়।
এর আগে হোয়েকস্ট্রা প্রকাশ্যে কানাডার রাজনীতিকদের মার্কিন রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কানাডার রাজনীতিকদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছেন এবং নির্বাচনে হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা দূতাবাসের প্রকাশিত তথ্যপত্রের দিকে সাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে অভিযোগের পক্ষে নতুন কোনো বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ্যে উপস্থাপিত হয়েছে এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি।
মার্কিন দূতাবাসের তথ্যপত্রে ২০১২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বেআইনিভাবে ভোট দেওয়ার অভিযোগে ১১ জন কানাডীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে কানাডা সরকারের কোনো নির্দেশনা বা পরিকল্পিত কার্যক্রমের যোগসূত্র দূতাবাস প্রতিষ্ঠা করেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া এবং একটি বিদেশি সরকার পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করা দুটি পৃথক বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রে অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাচনী নিরাপত্তাসংক্রান্ত আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা বিরল। ফলে বিচ্ছিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো বিদেশি সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
নির্বাচন নিয়ে এই বিরোধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্কের বিরুদ্ধে কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দুই দেশের শিল্প, ব্যবসা এবং সীমান্তপারের সরবরাহব্যবস্থায়।
গত আগস্টে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা ভেঙে পড়ে। কানাডার পক্ষ থেকে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো গ্রহণযোগ্য ছিল না। কার্নি এখন বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিকভাবে আলোচনায় ফিরতে চাইলে কানাডা প্রস্তুত। তবে গ্রহণযোগ্য চুক্তি না হলে কয়েক মাস, এমনকি পরবর্তী মার্কিন প্রশাসন ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেও তাঁর সরকার প্রস্তুত।
কানাডার অর্থনীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনার উদ্যোগও জোরদার করা হচ্ছে। কার্নির মতে, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় কানাডা নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখবে।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল করলে কানাডাকে দায়ী করা হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে কার্নি বলেছেন, তিনি তেমনটা প্রত্যাশা করেন না। তবে দুই দেশের মধ্যে শুল্ক নিয়ে বিরোধ থাকায় নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ তৈরির আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বেলাঁর মতে, দূতাবাসের উপস্থাপিত উদাহরণগুলো কানাডার পক্ষ থেকে মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের যথেষ্ট প্রমাণ নয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের আসন কমে গেলে কানাডাকে দায়ী করার রাজনৈতিক যুক্তি তৈরিতেও এসব অভিযোগ ব্যবহৃত হতে পারে। এটি একজন বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন; নির্বাচনের ফল সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।
সবশেষে কার্নি কানাডার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ট্রাম্প বিভিন্ন সময় কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার কথা বললেও কার্নি স্পষ্ট করেছেন, কানাডা স্বাধীন দেশ হিসেবেই নিজের পথ অনুসরণ করবে।
সার্বিকভাবে, কানাডার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ এবং কার্নির প্রত্যাখ্যান দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির নতুন দৃষ্টান্ত। তবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে কানাডা সরকার পরিকল্পিতভাবে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করতে চেয়েছে এমন দাবি প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য এবং যাচাইযোগ্য প্রমাণের পার্থক্য বজায় রাখাই এ ঘটনার নিরপেক্ষ মূল্যায়নের জন্য জরুরি।





