পুতিনকে ফোন পোপের, ইউক্রেনের অবরুদ্ধ শহরে যুদ্ধবিরতি ঘিরে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা
ইউক্রেনের অবরুদ্ধ ওলেশকি শহরে খাদ্য, চিকিৎসা সহায়তা ও নিরাপদে বেসামরিক মানুষ সরিয়ে নিতে পুতিনকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন পোপ চতুর্দশ লিও।
ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানবিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছেন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ চতুর্দশ লিও। গত ১৬ অক্টোবর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে তিনি ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলের ওলেশকি শহরে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান। খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া এবং সেখানে আটকে পড়া বেসামরিক মানুষকে স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরিই ছিল তাঁর এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। ভ্যাটিকানের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
পোপের এই আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ওলেশকি শহরে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরটির বাসিন্দাদের জন্য জরুরি সহায়তা পৌঁছানো এবং বিপজ্জনক এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভ্যাটিকানের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পুতিনের সঙ্গে আলোচনার সময় পোপ চতুর্দশ লিও খেরসন অঞ্চলের ওলেশকি শহরের গুরুতর মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি খাদ্য ও চিকিৎসাসহ জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। আলোচনার শেষে তিনি সংলাপ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভ্যাটিকানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
রয়টার্সের ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিনের পক্ষ থেকেও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে সহযোগিতার সম্মতি জানানো হয়। রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, শহরটির বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সরবরাহ পৌঁছে দেওয়ার জন্য পরিস্থিতি তৈরিতে ভ্যাটিকানের উদ্যোগকে সমর্থন করা হয়েছে। এ বিষয়ে সহযোগিতার ব্যাপারেও দুই পক্ষ একমত হয়েছে বলে রুশ পক্ষ জানায়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভ্যাটিকান সরাসরি যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তরের প্রাথমিক বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। সেখানে মূলত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতার কথা বলা হয়। ফলে পোপের আহ্বানের পরপরই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে—এমন দাবি করা সঠিক হবে না।
ভ্যাটিকানের পররাষ্ট্রবিষয়ক দায়িত্বে থাকা কার্ডিনাল পিয়েত্রো পারোলিন জানান, অবরুদ্ধ শহরটির মানুষের দুর্দশার বিষয়টি সামনে আনতে পোপ নিজেই উদ্যোগ নিয়ে পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শহরটিতে প্রায় দুই হাজার বেসামরিক মানুষের জন্য নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার পথ ও মানবিক সহায়তার ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়েছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পোপের অনুরোধের পর রুশ প্রেসিডেন্ট প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সম্মত হবেন।
ওলেশকি ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের খেরসন এলাকায় অবস্থিত। শহরটি ২০২২ সালে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। যুদ্ধের আগে সেখানে প্রায় ২৪ হাজার মানুষ বসবাস করতেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে শহরটিতে প্রায় এক হাজার সাত শ মানুষ রয়ে গিয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। যুদ্ধ, যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি এবং সরবরাহের প্রতিবন্ধকতা শহরটির মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে।
খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর পথে বাধা সৃষ্টি হওয়া নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরকে দোষারোপ করেছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইউক্রেনের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কোন পক্ষ কতটা দায়ী, তা নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত। তাই কোনো এক পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
পোপের উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত খবরের পর। ফিন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওলেশকি শহরের আশপাশে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সীমিত যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এ উদ্যোগে পোপ চতুর্দশ লিও এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সীমিত যুদ্ধবিরতির ঘোষণা মানেই সব ধরনের সংঘর্ষ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। এর বাস্তবায়ন, সময়সীমা, নিরাপদ চলাচলের পথ এবং সহায়তা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতেও মানবিক করিডর নিয়ে সমঝোতার পর বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ দেখা গেছে। তাই ওলেশকির বাসিন্দারা বাস্তবে কতটা নিরাপদে সহায়তা পাবেন, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কার্যকর সহযোগিতার ওপর।
এদিকে পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের কয়েক দিন পর, ১৯ অক্টোবর পোপ চতুর্দশ লিও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গেও কথা বলেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ওই আলোচনায়ও ওলেশকির বাসিন্দাদের জন্য মানবিক সহায়তা এবং নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সংকট সমাধানে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়েছে।
সব মিলিয়ে, পোপ চতুর্দশ লিওর উদ্যোগ ওলেশকির মানবিক সংকট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ। তবে এই প্রচেষ্টা স্থায়ী ফল দেবে কি না, তা নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধান এখনো অনিশ্চিত হলেও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় এই ধরনের মানবিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।





