অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
ইউক্রেনের স্টারলিংক সচল, ড্রোন হামলার অভিযোগে ইলন মাস্কের সঙ্গে নতুন বিতর্কে ওয়াশিংটন
ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা আবার সচল হয়েছে। তবে বিধিনিষেধের কারণ, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং সামরিক কাজে স্যাটেলাইট ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগে ব্যবহৃত স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থার কার্যক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বিধিনিষেধের পর গত ২৪ অক্টোবর ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলমান সরঞ্জামেও সংযোগ স্থিতিশীল রয়েছে। একই দিনে স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক অভিযোগ করেন, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী বেসামরিক বাণিজ্যিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রাণঘাতী আক্রমণকারী ড্রোন পরিচালনা করেছে, যা প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারের শর্তের লঙ্ঘন। তবে তাঁর অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। রয়টার্স, ফক্স নিউজ এবং ইউক্রেনের সরকারি সূত্রে প্রকাশিত তথ্য যাচাই করে এসব বিষয় জানা গেছে।
মাস্কের বক্তব্যের পাশাপাশি ইউক্রেনের যোগাযোগব্যবস্থা সচল হওয়ার ঘোষণা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—কার সিদ্ধান্তে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, কেন তা কার্যকর করা হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের মালিকানাধীন স্টারলিংক নিম্ন কক্ষপথে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ সরবরাহ করে। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে সামরিক যোগাযোগ, সম্মুখসারির সেনাদের সমন্বয়, রসদ সরবরাহ এবং চালকবিহীন আকাশযানের কার্যক্রমে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যুদ্ধের কারণে প্রচলিত যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প সংযোগ হিসেবে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
স্টারশিল্ড একই প্রযুক্তিগত ভিত্তির ওপর নির্মিত হলেও এটি মূলত বিশেষায়িত সরকারি ও সামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি। এর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের ভূমিকা রয়েছে। স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডকে একই ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করলে সাম্প্রতিক বিরোধের প্রকৃত চিত্র অস্পষ্ট হয়ে যায়।
গত সপ্তাহে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, দ্রুতগতিতে চলমান সামরিক সরঞ্জামে স্যাটেলাইট সংযোগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিতে চলা সরঞ্জামে সংযোগ বিঘ্নিত হওয়ার কথা জানানো হয়। এর ফলে কিছু চালকবিহীন আকাশযানের অভিযান ব্যাহত হয় এবং কয়েকটি কার্যক্রম বাতিল করতে হয় বলে ইউক্রেনীয় সূত্রের দাবি।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর জন্য সমস্যাটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, দেশটি শুধু আক্রমণ পরিচালনার জন্য নয়, রাশিয়ার নিক্ষিপ্ত আক্রমণকারী ড্রোন প্রতিহত করা, সম্মুখসারিতে তথ্য আদান-প্রদান এবং সামরিক রসদ পৌঁছানোর কাজেও স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবহার করে। দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ড্রোন পরিচালনার সময় নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গত ২৪ অক্টোবর ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলমান সরঞ্জামেও স্থিতিশীল সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় জানায়। এই গতি ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ মাইলের সমান।
দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও জানান, বিধিনিষেধের আগে যে গতিতে যোগাযোগব্যবস্থা কাজ করত, তা আবার ফিরেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুনরুদ্ধার হওয়া সংযোগ সম্মুখসারির রসদ সরবরাহ, সামরিক যোগাযোগ এবং রাশিয়ার দ্রুতগতির আক্রমণকারী ড্রোন প্রতিরোধে সহায়ক হবে। তিনি এই উদ্যোগে সহায়তাকারী যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং অন্যান্য অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তবে যোগাযোগব্যবস্থা সচল হওয়ার ঘোষণা এবং বিধিনিষেধের জন্য কে দায়ী এ দুটি আলাদা বিষয়। প্রথমটির পক্ষে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ্য ঘোষণা রয়েছে। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে এখনো পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান রয়েছে।
সেবা পুনরুদ্ধারের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্ক বলেন, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী স্টারলিংকের ব্যবহারের শর্ত লঙ্ঘন করে মানুষ হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণকারী ড্রোন পরিচালনায় এটি ব্যবহার করেছে। তাঁর দাবি, এই ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্টারলিংক ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় পৃথিবীর অন্য যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি অবদান রেখেছে।
মাস্কের বক্তব্যের দুটি দিক রয়েছে। একদিকে তিনি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় স্টারলিংকের অবদান তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে বাণিজ্যিক যোগাযোগব্যবস্থাকে প্রাণঘাতী আক্রমণ পরিচালনার কাজে ব্যবহারের বিরোধিতা করেছেন। তবে তাঁর বক্তব্যকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা ঘটনার বিবরণ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের পাল্টা বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবহারের প্রযুক্তিগত তথ্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা সেরহি বেস্করেস্তনভ এর আগে দাবি করেন, দূরপাল্লার ও মাঝারি পাল্লার আক্রমণকারী ড্রোন পরিচালনায় স্টারলিংক ব্যবহারের বিষয়ে মাস্কের অভিযোগ সঠিক নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ড্রোনের নির্দিষ্ট কার্যক্রমে স্টারলিংকের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি মাস্কের বর্ণনার সঙ্গে মেলে না। ফলে কোন ধরনের ড্রোনে কোন যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে, তা নির্ধারণ করতে আরও প্রযুক্তিগত তথ্য প্রয়োজন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা এবং সেই প্রযুক্তি নিজেই অস্ত্র হিসেবে কাজ করা এক বিষয় নয়। স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সামরিক বাহিনীকে তথ্য আদান-প্রদান, নির্দেশনা পাঠানো এবং ড্রোন পরিচালনায় সহায়তা করতে পারে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট আক্রমণে সেটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম, কার্যক্রম এবং প্রমাণ পরীক্ষা করতে হবে।
বিধিনিষেধের নির্দেশ কে দিয়েছিল, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টারশিল্ডের কার্যক্রম সীমিত করার নির্দেশ হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকে এসেছিল বলে একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে মাস্ক এর আগে দাবি করেছিলেন, স্টারশিল্ডের গতি বা ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্বাধীন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কর্মকর্তারা আবার বিধিনিষেধ আরোপে সরকারের ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি একপর্যায়ে বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে সমস্যার সমাধান করবেন। তবে বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্তে তাঁর ব্যক্তিগত ভূমিকা কী ছিল, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে নিশ্চিত ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে মাস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এবং ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি রয়ে গেছে।
এই বিরোধ শুধু একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পরিষেবা ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়। যুদ্ধের সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর একটি দেশের সামরিক নির্ভরতা কতটা নিরাপদ, সেটিও সামনে এসেছে। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিগত বা চুক্তিগত কারণে পরিষেবা সীমিত করলে তার প্রভাব সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা ও রসদ ব্যবস্থায় পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের জন্যও ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্যাটেলাইট যোগাযোগের প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যিক ব্যবহারের শর্ত এবং সামরিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমারেখা নির্ধারণ সহজ নয়। এ ধরনের ব্যবস্থায় স্বচ্ছ নিয়ম, আগাম সতর্কতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
২৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত যাচাইযোগ্য তথ্য বলছে, ইউক্রেন স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়েছে এবং ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলমান সরঞ্জামে স্থিতিশীল সংযোগের কথা জানিয়েছে। ইলন মাস্ক ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন, কিন্তু অভিযোগের সব দিক স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। একইভাবে বিধিনিষেধের চূড়ান্ত নির্দেশদাতা কে, সে প্রশ্নেরও প্রকাশ্য ও সর্বসম্মত উত্তর মেলেনি। তাই ঘটনাটিকে নিশ্চিত অপরাধ বা একক পক্ষের দোষ হিসেবে নয়, বরং প্রমাণ, পাল্টা বক্তব্য ও চলমান অনুসন্ধানের আলোকে মূল্যায়ন করাই যথাযথ।

ভোট দিতে যাতায়াতে এক টাকাও নয়, নির্বাচনের দিন হিউস্টনে বিনা ভাড়ায় বাস-রেল

পুরোনো বিরোধ পেছনে ফেলে মিশিগানে এল-সাইয়েদের পাশে ওবামা, ভোটের মাঠে নতুন উত্তাপ

ট্রাম্পের রসিকতায় হাসির ঝড়, জেসন অ্যালডিয়ানের স্ত্রীকে নিয়ে মন্তব্য ঘিরে তুমুল আলোচনা




