নিউইয়র্কে বন্দুক সহিংসতা ঠেকাতে তিন এলাকায় কর্মসূচি সম্প্রসারণ করলেন মেয়র জোহরান মামদানি
নিউইয়র্কের ব্রুকলিন ও ম্যানহাটনের চার পাড়ায় বন্দুক সহিংসতা প্রতিরোধে কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচি সম্প্রসারণে ৪৮ লাখ ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন মেয়র মামদানি।
নিউইয়র্ক সিটির তিনটি নতুন সেবা এলাকায় বন্দুক সহিংসতা প্রতিরোধে কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচি সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানি। নগর প্রশাসনের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ব্রুকলিনের বুশউইক এবং ম্যানহাটনের হারলেম, ওয়াশিংটন হাইটস ও ইনউড এলাকায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। কর্মসূচিটির মূল লক্ষ্য হলো সংঘাত সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা।
২০ অক্টোবর প্রকাশিত মেয়র কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সম্প্রসারণের জন্য মোট ৪৮ লাখ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। তিনটি সেবা এলাকার প্রতিটির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ লাখ ডলার। এই অর্থ দিয়ে স্থানীয় সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করবে, নতুন কর্মী নিয়োগ করবে এবং সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাবে। উদ্যোগটির আওতায় সংঘাত নিরসন, তরুণদের পরামর্শদান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নগর প্রশাসনের সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষিত কর্মীরা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তাঁরা এলাকার বিরোধ ও উত্তেজনার খবর পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠার আগেই তা শান্ত করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি সহিংসতার শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রতিশোধমূলক হামলা ঠেকানোর কাজও করেন তাঁরা।
এই কর্মসূচিতে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ, এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের কাছে পৌঁছানো, তাঁদের আস্থা অর্জন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া তুলনামূলক সহজ হয়। নগর প্রশাসনের লক্ষ্য, শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং সংঘাতের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে আগেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
বুশউইকে ‘দ্য উইক এগেইনস্ট ভায়োলেন্স’ কর্মসূচির কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। দক্ষিণসাইড ইউনাইটেড পরিচালিত এই উদ্যোগ আগে থেকেই উডহাল হাসপাতাল ও বুশউইক হাউসেস এলাকায় কাজ করছে। নতুন অর্থায়নের ফলে প্রতিষ্ঠানটি আশপাশের আরও বাসিন্দার কাছে পৌঁছাতে পারবে। বন্দুক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা তরুণ ও পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাত নিরসনের কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
হারলেমে লিভিং রিডেম্পশন নামের সংগঠনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। সংগঠনটি স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাত মধ্যস্থতা, তরুণদের পরামর্শদান এবং পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কাজ করে। নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে আরও বেশি তরুণকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সামাজিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিকল্প সুযোগ তৈরি এবং সহিংসতা থেকে দূরে থাকার পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে।
ওয়াশিংটন হাইটস ও ইনউড এলাকায় গ্রো আপ গ্রো আউট জুনিয়রের মাধ্যমে নতুন একটি পথপর্যায়ের সহায়তা দল গঠন করা হবে। ইউনাইটেড ওয়ের পরিচালনায় এই দলটি এলাকায় সরাসরি যোগাযোগ, সংঘাত নিরসন এবং সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ধারাবাহিক সহায়তা দেওয়ার কাজ করবে। এর আগে এই এলাকায় নগর প্রশাসনের সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির আওতায় এমন সেবা চালু ছিল না। নতুন দল গঠনের ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা সহিংসতা প্রতিরোধমূলক সহায়তা পাওয়ার আরও সুযোগ পাবেন।
নগর প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কের সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি সম্প্রসারণের আগে ৪৬টি পাড়া বা সেবা এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। নতুন তিনটি সেবা এলাকা যুক্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা বেড়ে ৪৯টিতে দাঁড়াবে। প্রশাসনের মতে, স্থানীয় অপরাধের তথ্য, বিদ্যমান সেবার ঘাটতি এবং কমিউনিটির চাহিদা বিবেচনা করেই নতুন এলাকাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
মেয়র মামদানি বলেছেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংঘাত প্রতিরোধ, তরুণদের সহায়তা এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রশাসনের পরিকল্পনা হলো, যেসব সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মানুষের আস্থা অর্জন করেছে, তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ ও সহায়তা দিয়ে আরও কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া।
নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ পাড়া, শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশ এবং তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পারিবারিক জীবন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশি পরিবার এসব এলাকায় বসবাস করেন, কাজ করেন কিংবা সন্তানদের নিয়ে যাতায়াত করেন, তাঁদের জন্য স্থানীয় নিরাপত্তা উদ্যোগ সম্পর্কে জানা উপকারী।
তবে কর্মসূচি সম্প্রসারণের ঘোষণা মানেই অবিলম্বে সহিংসতা কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উদ্যোগটির প্রকৃত কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য ভবিষ্যতে বন্দুক হামলা ও আহতের সংখ্যা, সেবাপ্রাপ্ত মানুষের পরিসংখ্যান এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অর্থায়নের যথাযথ ব্যবহার, প্রশিক্ষিত কর্মীদের ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং সামাজিক সহায়তার সুযোগ কতটা বাড়ছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নিউইয়র্কের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ ও কমিউনিটির অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা। নতুন তিনটি সেবা এলাকায় কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংঘাত কমানো, ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সহায়তা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পাড়া গড়ে তোলার চেষ্টা করবে নগর প্রশাসন।





