যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভয়াবহ ঝড়-বন্যার তাণ্ডব, বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, বিপর্যস্ত জনজীবন
প্রবল ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এবং বহু এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রবল ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অ্যারিজোনা, ইউটাহ, কলোরাডো ও নিউ মেক্সিকোর বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর, যানবাহন, বিদ্যুতের খুঁটি এবং গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও ঝড়ের তাণ্ডবে বাড়ির ছাদ উড়ে গেছে, কোথাও উপড়ে পড়া গাছ গাড়ি ও স্থাপনার ওপর আছড়ে পড়েছে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টিতে নদী ও ছোট জলধারার পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বিভাগের কর্মীরা উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ব্যস্ত রয়েছেন।
২৩ অক্টোবর প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যারিজোনায় ঝড়ের পর অন্তত তিনটি সম্ভাব্য টর্নেডোর আঘাতের বিষয়ে আবহাওয়াবিদেরা তদন্ত করছেন। অঙ্গরাজ্যটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে প্রবল বাতাস ও বড় আকারের শিলাবৃষ্টি ঘরবাড়ি, গাড়ি এবং বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষতি করেছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। হেবার-ওভারগার্ড এলাকায় ঝড়ে গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে অন্তত একজন আহত হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আহত ব্যক্তির অবস্থা প্রাণঘাতী নয় বলে জানানো হয়েছে।
অ্যারিজোনার মেসা শহরে ঝড়ের তাণ্ডব বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। আবাসিক এলাকার বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে গাড়ি ও গাড়ি রাখার ছাউনির ক্ষতি করেছে। কোথাও গাছের ভারে ছাউনি বেঁকে গেছে, আবার কোথাও গাড়ির কাচ ভেঙে গেছে। পার্ক ও খেলার মাঠের আশপাশেও গাছ ভেঙে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। ঝড়ের পর সড়ক ও আবাসিক এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ডালপালা ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে কর্মীদের কাজ করতে হয়েছে।
শিলাবৃষ্টির কারণে উত্তর ও মধ্য অ্যারিজোনার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ির ছাদ, জানালা এবং গাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কিছু স্থানে শিলার আকার গলফ খেলার বলের সমান ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবল বাতাসের সঙ্গে বজ্রঝড় পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। অঙ্গরাজ্যটিতে টর্নেডোর সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা জারি হওয়ায় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার এবং জানালা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, বছরের এই সময়ে এমন তীব্র ঝড় ওই অঞ্চলের জন্য অস্বাভাবিক।
ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও বন্যার কারণে উদ্বেগ বেড়েছে। হারিকেন শহরে বন্যার পানি প্রায় ৮০টি বাড়ি এবং বিনোদনযান রাখার একটি স্থানের ৫০টি যানবাহনের কাছে পৌঁছে যায়। শহর কর্তৃপক্ষ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। বন্যার বাদামি পানিতে রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে চলাচল ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সব ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি বা যানবাহনের চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো নিশ্চিত নয়।
কলোরাডোর দক্ষিণাঞ্চলেও নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সান হুয়ান নদীসহ চারটি নদীর আশপাশের নিচু এলাকায় বাধ্যতামূলকভাবে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হয়। পাগোসা স্প্রিংস এলাকায় নদীর পানি বাড়তে থাকায় স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। গত বছরের বন্যার অভিজ্ঞতার কারণে এবার আগেভাগে সতর্কতা ও সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নদীর পানি কতটা বাড়বে, তা পর্যবেক্ষণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হচ্ছে।
নিউ মেক্সিকোর পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলেও ভারী বৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। আবহাওয়াবিদেরা জানান, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা আর্দ্র বাতাস এবং নিম্নচাপের প্রভাবে একের পর এক বৃষ্টিবাহী মেঘ তৈরি হচ্ছে। কিছু এলাকায় ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা থাকায় শুকনো নদীখাত, নালা, সেতুর নিচু অংশ এবং পানি পারাপারের পথগুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। মরুভূমি অঞ্চলে সাধারণত শুকনো থাকা জলধারায় হঠাৎ পানি নেমে এলে মানুষ ও যানবাহন দ্রুত বিপদে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি হলে মাটি অতিরিক্ত পানি শোষণ করতে পারে না। ফলে অল্প সময়ের ভারী বর্ষণও দ্রুত প্রবাহ সৃষ্টি করে নিচু এলাকায় পানি জমাতে পারে। পাহাড়ি ঢাল, সরু গিরিখাত এবং আগে দাবানলে পুড়ে যাওয়া অঞ্চলে কাদামাটি ও পাথর নেমে আসার ঝুঁকিও থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু এলাকা শুষ্ক জলবায়ুর জন্য পরিচিত হওয়ায় সেখানে হঠাৎ বন্যা দেখা দিলে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কম পাওয়া যায়।
বন্যা ও ঝড়ের সময় কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের সতর্কবার্তা অনুসরণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যাওয়া এবং পানিতে ডুবে থাকা সড়ক দিয়ে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। চলমান পানির গভীরতা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন; সামান্য পানির প্রবাহও গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নষ্ট করতে পারে। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে থাকলে সেখান থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির একাধিক ঘটনা নিশ্চিত হলেও পুরো অঞ্চলের মোট আর্থিক ক্ষতি, সব এলাকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো নির্ধারিত হয়নি। তাই ক্ষয়ক্ষতির সামগ্রিক হিসাব প্রকাশের আগে আরও তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে। আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন করে বৃষ্টি বা ঝড় দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।





