ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহে গিয়ে আটক, সবাইকে মুক্তির দাবি ইলহান ওমরের
৭,৪২৭ বার পড়া হয়েছে ৫ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ইসরায়েলের কাছে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জলপাই সংগ্রহে সহায়তা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক দলের কংগ্রেস প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডারসহ বহু স্বেচ্ছাসেবীর আটক হওয়ার ঘটনা। ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর বেথলেহেমের কাছাকাছি নাহালিন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ল্যান্ডারকে কয়েক ঘণ্টা পর সতর্কবার্তা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যদের মধ্যেও অনেকে তখন আটক ছিলেন। তবে ইলহান ওমরের নির্দিষ্ট বক্তব্যের মূল পোস্ট বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্ক এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে প্রবেশাধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। ফিলিস্তিনি কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো স্বেচ্ছাসেবীদের আটক করার ঘটনায় মানবাধিকারকর্মী ও কয়েকজন মার্কিন রাজনীতিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিউইয়র্কের সাবেক নগর নিয়ন্ত্রক ব্র্যাড ল্যান্ডার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হওয়ার জন্য ডেমোক্র্যাটিক দলের মনোনীত প্রার্থী। তিনি নিউইয়র্কের দশম কংগ্রেসনাল আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর এই আটক হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে। ল্যান্ডার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি কয়েকজন ধর্মীয় নেতা ও আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জলপাই সংগ্রহে সহায়তা করছিলেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে কৃষিকাজে অংশ নিয়েছিলেন। পরে ইসরায়েলি সেনা ও পুলিশ সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁদের আটক করেন এবং বাসে করে নিয়ে যান। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন রাব্বিস ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ওই কর্মসূচিতে প্রায় ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবী অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অন্যান্য দেশের নাগরিক ছিলেন। ল্যান্ডার ছাড়াও কয়েকজন ইহুদি ধর্মীয় নেতা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী ওই দলে ছিলেন। ল্যান্ডার আটকের পর নিজের অবস্থান জানিয়ে বলেন, তিনি ফিলিস্তিনি কৃষকদের নিজেদের জমিতে ফসল সংগ্রহের কাজে সহায়তা করছিলেন। পরে তাঁকে সতর্কবার্তা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি মন্তব্য করেন, তাঁর পরিচিতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে হয়তো দ্রুত মুক্তি পেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, অন্য স্বেচ্ছাসেবীদেরও মুক্তি দেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্যে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জমিতে যাতায়াত, কৃষিকাজ এবং নিজেদের বাড়িতে বসবাসের অধিকারের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি কৃষকদের জলপাইবাগানে যেতে বাধা দেওয়া তাঁদের জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক মূল্যায়ন এবং আটকের ঘটনাকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অবশ্য ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট এলাকায় জলপাই সংগ্রহের আগে নিরাপত্তাসংক্রান্ত অনুমতি বা সমন্বয় প্রয়োজন ছিল। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, যথাযথ সমন্বয় ছাড়াই সেখানে বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবীর উপস্থিতি নিরাপত্তার উদ্বেগ তৈরি করেছিল। এ কারণে সেনা ও পুলিশ সদস্যরা সেখানে গিয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের আটক করেন। অন্যদিকে, স্বেচ্ছাসেবীদের আয়োজক সংগঠনের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন, তাঁরা কৃষকদের আমন্ত্রণে সেখানে গিয়েছিলেন এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছিলেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ পরে এলাকাটিকে বন্ধ সামরিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। সংগঠনটির প্রতিনিধিরা আরও বলেছেন, ওই এলাকায় প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন—এমন নির্দেশনা সম্পর্কে তাঁরা আগে থেকে অবগত ছিলেন না। এখানেই ঘটনার মূল বিরোধ। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও অনুমতির প্রশ্ন সামনে আনছে, আর স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, তাঁরা ফিলিস্তিনি কৃষকদের নিজেদের জমিতে ফসল সংগ্রহের কাজে সহযোগিতা করছিলেন। সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রবেশসংক্রান্ত নিয়ম এবং তা কার্যকর করার পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রশ্নও উঠেছে। আটকের পর ল্যান্ডারকে মুক্তি দেওয়া হলেও অন্যদের বিষয়ে উদ্বেগ অব্যাহত ছিল। সংবাদমাধ্যমের পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ আটক ব্যক্তিকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ইসরায়েলি পুলিশের বক্তব্যে উঠে আসে। তাই সবাইকে একই সময়ে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল—এমন দাবি করা সঠিক হবে না। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং আরও কয়েকজন ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক প্রতিক্রিয়া জানান। মামদানি ল্যান্ডারের মুক্তিতে স্বস্তি প্রকাশ করলেও অন্য আটক ব্যক্তিদেরও দ্রুত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও বিদেশে আটক মার্কিন নাগরিকদের বিষয়ে অবগত থাকার কথা জানায় এবং তাদের যথাযথ চিকিৎসা, আচরণ ও কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করার দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে। এদিকে ইলহান ওমরকে ঘিরে প্রচারিত বক্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটির সুনির্দিষ্ট ভাষা ও প্রকাশের সময় নিশ্চিত করার জন্য তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট অথবা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রয়োজন। এ ধরনের প্রাথমিক সূত্র ছাড়া তাঁর নামে উদ্ধৃতি প্রকাশ করা বা বক্তব্যের অতিরিক্ত বিবরণ যোগ করা উচিত নয়। তবে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি এবং ঘটনাটির বিরুদ্ধে মার্কিন রাজনীতিকদের সমালোচনার বিষয়টি একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহ কেবল কৃষিকাজ নয়; এটি বহু ফিলিস্তিনি পরিবারের জীবিকা, ঐতিহ্য ও জমির সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলপাই ও জলপাইয়ের তেল বিক্রি করে অনেক পরিবার বছরের উল্লেখযোগ্য আয় করে। ফসল সংগ্রহের মৌসুমে নিরাপত্তাঝুঁকি, চলাচলে বাধা এবং জমিতে প্রবেশ নিয়ে বিরোধ তাঁদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনি কৃষক ও তাঁদের সহায়তাকারীদের ওপর হামলা, জমিতে প্রবেশে বাধা এবং বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে সংঘাতের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন কৃষকদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের জমিতে নির্বিঘ্নে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি পশ্চিম তীরে কৃষিকাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অধিকৃত ভূখণ্ডে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, সম্পত্তির অধিকার এবং চলাচলের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট আটকের ঘটনা আইনসম্মত ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিধান, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ, ঘটনার প্রমাণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করতে হয়। কেবল কোনো পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ব্র্যাড ল্যান্ডারকে আটক ও পরে মুক্তি দেওয়ার ঘটনা তাই শুধু একজন মার্কিন নির্বাচনী প্রার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমিতে প্রবেশাধিকার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবীদের ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া এই বিতর্ককে আরও দৃশ্যমান করেছে।