নিউইয়র্কে ১৭০ বছরের ঘোড়ার গাড়ির ঐতিহ্য বন্ধের পথে, ট্রাম্পের অসন্তোষ
৭,৪৩৬ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বন্ধের পথে। নগর পরিষদে ৪০-৭ ভোটে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব পাস হওয়ার পর পর্যটন, পশুকল্যাণ, জননিরাপত্তা এবং শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, ঘোড়ার গাড়ির চালক ও মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী শ্রমিক সংগঠন আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তথ্য যাচাইয়ে দেখা গেছে, ঘটনাটি কেবল একটি প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে নেই। ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর নিউইয়র্ক নগর পরিষদে ‘রোমাঞ্চের আইন’ নামে পরিচিত প্রস্তাবটি ৪০-৭ ভোটে পাস হয়েছে; দুই সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ১ জুন থেকে শহরে ঘোড়ায় টানা যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ করার কথা রয়েছে। তবে পরিষদে পাস হওয়া এবং আইনটির কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্কের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ১৮ বছর বয়সী ভারতীয় পর্যটক রোমাঞ্চ মহাজনের মর্মান্তিক মৃত্যু। ২০২৬ সালের জুনে সেন্ট্রাল পার্কে পরিবারের সঙ্গে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার সময় দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়ির চালক যাত্রীদের ছবি তোলার জন্য গাড়ি থেকে নেমেছিলেন। এ সময় ঘোড়াটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছুটতে শুরু করে। গাড়িতে থাকা যাত্রীরা ছিটকে পড়েন এবং মহাজন গুরুতর আঘাত পান। এই ঘটনা ঘোড়ার গাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে আসে। মহাজনের মৃত্যুর পর পশুকল্যাণকর্মী, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নাগরিক এবং নিষেধাজ্ঞার পক্ষে থাকা জনপ্রতিনিধিরা ঘোড়ার গাড়ি বন্ধের দাবি আরও জোরালো করেন। তাঁদের যুক্তি, বিপুলসংখ্যক পর্যটক, সাইকেলচালক, পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচলের কারণে সেন্ট্রাল পার্ক আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যস্ত। এমন পরিবেশে বড় আকারের ঘোড়া ও ভারী যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচল করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ঘোড়া ভয় পেয়ে হঠাৎ ছুটে গেলে চালক, যাত্রী, পথচারী এবং ঘোড়া—সব পক্ষই বিপদে পড়তে পারে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের ইতিহাস নতুন নয়। নিউইয়র্কে ১৮৫৮ সাল থেকে ঘোড়ায় টানা যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচল করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একসময় শহরের যাতায়াতব্যবস্থায় ঘোড়ার গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মোটরচালিত যানবাহনের প্রসারের পর এর ব্যবহার কমে গেলেও সেন্ট্রাল পার্কে পর্যটকদের আকর্ষণ হিসেবে এটি টিকে থাকে। বহু পর্যটক পার্কের গাছপালা, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং নগরের দৃশ্য দেখতে ঘোড়ার গাড়িতে ভ্রমণ করেন। ফলে এই পরিবহনব্যবস্থা কেবল ব্যবসা নয়, শহরের পরিচিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হয়ে এসেছে। এই ঐতিহ্য বন্ধের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে চালক ও মালিকদের জীবিকা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, এই শিল্পের সঙ্গে প্রায় ১৫০ জন সক্রিয় চালক এবং আরও অনেক মালিক ও আস্তাবলের কর্মী যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ বহু বছর ধরে এই পেশায় কাজ করছেন। কিছু পরিবারের একাধিক প্রজন্ম ঘোড়ার গাড়ির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের কাছে ঘোড়া, গাড়ি এবং চলাচলের অনুমতিপত্র শুধু ব্যবসার উপকরণ নয়, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও পারিবারিক জীবিকার অংশ। নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতাকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে এই শিল্প বন্ধ করা উচিত নয়। চালক ও মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী পরিবহন শ্রমিক সংগঠন জানিয়েছে, নগর পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংগঠনটির আইনজীবীর বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞার ফলে চালকদের পেশাগত অনুমতিপত্র, গাড়ি এবং ব্যবসায়িক সম্পদের ব্যবহার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে, কিছু মালিক ঘোড়ার গাড়ি চালানোর অনুমতিপত্র পেতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে সেই বিনিয়োগের মূল্য হারিয়ে যেতে পারে। শ্রমিক সংগঠনটি আরও বলেছে, আইনটি কার্যকর হলে তারা ফেডারেল আদালতে নিষেধাজ্ঞা ঠেকানোর আবেদন করতে পারে। তাদের লক্ষ্য হবে আদালতের মাধ্যমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আদায় করা, যাতে আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নতুন আইন বাস্তবায়ন স্থগিত রাখা যায়। তবে আদালত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সংগঠনের বক্তব্য এবং সম্ভাব্য আইনি যুক্তি তাদের নিজস্ব অবস্থান; এগুলোকে আদালতে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। একইভাবে, মামলা করার ঘোষণা দেওয়া মানেই মামলা দায়ের হয়েছে বা নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হয়েছে—এমন নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ঘোড়ার গাড়িকে নিউইয়র্কের পরিচিত ঐতিহ্য হিসেবে উল্লেখ করে সিদ্ধান্তটি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁর যুক্তি, একটি দুর্ঘটনার কারণে দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্য বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। তিনি গাড়ি দুর্ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে প্রশ্ন তোলেন, শহরে অন্য যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হলেও সেগুলো চলাচল বন্ধ করা হয় না কেন। তাঁর এই বক্তব্য নিষেধাজ্ঞা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার সমর্থকেরা বলছেন, বিষয়টি শুধু একটি দুর্ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; বরং পশুর নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ রক্ষার দীর্ঘদিনের দাবি। তাঁদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ নগরে যানবাহন, পথচারী ও পর্যটকের ভিড়ের মধ্যে ঘোড়ার গাড়ি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পশুকল্যাণকর্মীরা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ব্যস্ত সড়ক ও পার্কের পরিবেশে ঘোড়াগুলো যথেষ্ট বিশ্রাম, উপযুক্ত পরিচর্যা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাচ্ছে কি না। তাঁদের মতে, ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানুষের জীবন ও প্রাণীর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। নগর পরিষদের স্পিকার জুলি মেনিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে দেওয়া, পেশাগত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ, চাকরির মেলায় অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে প্রশাসনের কর্মী-সহায়তা পরিকল্পনা তৈরি করার কথা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বিস্তারিত বাস্তবায়ন, অর্থায়ন এবং প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত কর্মী কতটা সহায়তা পাবেন, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ঘোড়াগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবে অবসর নেওয়া ঘোড়াগুলোর মানবিক পরিচর্যার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, ঘোড়াগুলোকে জবাইয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রি বা অন্য ঘোড়ার গাড়ির ব্যবসায় ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর ঠেকানোর বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মালিকেরা চাইলে নিজেদের ঘোড়া রেখে দেওয়ার সুযোগও পাবেন। তবে অবসরপ্রাপ্ত ঘোড়াগুলোর দীর্ঘমেয়াদি খাবার, চিকিৎসা, আশ্রয় এবং পরিচর্যার ব্যয় কে বহন করবেন, সে বিষয়ে আরও পরিষ্কার পরিকল্পনা প্রয়োজন। নিষেধাজ্ঞার পক্ষে থাকা নেতারা মনে করছেন, প্রায় দুই বছরের পরিবর্তনকাল কর্মীদের নতুন পেশায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করবে। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, প্রশিক্ষণ ও চাকরির পরামর্শ দিলেই বহু বছরের ব্যবসায়িক ক্ষতি পূরণ হবে না। তাঁদের দাবি, ঘোড়ার গাড়ির অনুমতিপত্র ও ব্যবসায়িক সম্পদের মূল্য বিবেচনা করে ন্যায্য ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আইনটিতে ক্ষতিপূরণ বিবেচনার কথা থাকলেও প্রত্যেক মালিক বা চালক নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ পাবেন—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। এ কারণেই সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে সম্পত্তির অধিকার, জীবিকা এবং নগর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার প্রশ্ন।