চার্লি কার্ক হত্যা মামলায় ২০২৭ সালেই বিচার চান স্ত্রী এরিকা, ২০২৯ পর্যন্ত বিলম্বের বিরোধিতা
৬,৩২৫ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
চার্লি কার্ক হত্যা মামলার বিচার শুরু হওয়ার সময় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের আদালতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিহত রাজনৈতিক কর্মী চার্লি কার্কের স্ত্রী এরিকা কার্ক চান, তাঁর স্বামীকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত টাইলার রবিনসনের বিচার ২০২৭ সালেই শুরু হোক। অন্যদিকে, অভিযুক্তের আইনজীবীরা মামলার প্রস্তুতির জন্য আরও দীর্ঘ সময় চেয়ে ২০২৯ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে বিচার শুরুর সম্ভাব্য সময় প্রস্তাব করেছেন। এরিকা কার্কের আইনজীবীরা আদালতে দাখিল করা নতুন নথিতে ওই সময়সূচিকে তুলনীয় মামলাগুলোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বিচারপ্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্ব এড়িয়ে যত দ্রুত সম্ভব মামলাটির নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া উচিত। মামলাটির সময়সূচি নিয়ে এই বিরোধ সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন আদালত উভয় পক্ষকে বিচার শুরুর সম্ভাব্য তারিখ, প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় এবং বিচার কত দিন চলতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত হিসাব জমা দিতে বলেছে। ইউটাহর চতুর্থ জেলা আদালতের বিচারক টনি গ্রাফের নির্দেশ অনুযায়ী, দুই পক্ষের প্রস্তাব বিবেচনা করে পরবর্তী শুনানিতে মামলার অগ্রগতির সময়সূচি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। তবে আইনজীবীদের প্রস্তাবিত তারিখগুলো চূড়ান্ত নয়। বিচারকই শেষ পর্যন্ত সময়সূচি নির্ধারণ করবেন। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরিকা কার্কের আইনজীবীরা ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর আদালতে আবেদন করে ২০২৯ সালের প্রস্তাবিত সময়সূচি প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান। তাঁরা চান, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ২০২৭ সালে বিচার শুরু করা হোক। পাশাপাশি মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও তাঁদের আবেদনে উঠে এসেছে। তাঁদের যুক্তি, হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার শুরুর জন্য প্রায় চার বছর অপেক্ষা করা হলে নিহত ব্যক্তির পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত টাইলার রবিনসনের আইনজীবীদের বক্তব্য হলো, মামলাটি অত্যন্ত জটিল এবং মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা থাকায় প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন। তাঁদের প্রস্তাবে ২০২৯ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে বিচার শুরু করার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়া সাত মাস পর্যন্ত চলতে পারে বলেও তাঁদের সময়সূচিতে ধারণা দেওয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ তথ্যপ্রমাণ যাচাই, সম্ভাব্য আইনি আবেদন তৈরি, অপরাধের অভিযোগের পক্ষে ও বিপক্ষে প্রমাণ পরীক্ষা এবং নিরপেক্ষ বিচারকমণ্ডলী বাছাইয়ের জটিলতাকে তাঁরা বিলম্বের কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন। এই মামলায় প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান আবার দুই পক্ষের মাঝামাঝি। ইউটাহ কাউন্টির সরকারি কৌঁসুলিরা ২০২৮ সালের ৩১ জানুয়ারি বিচার শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, বিচারপ্রক্রিয়া প্রায় ১৭ সপ্তাহ চলতে পারে। অর্থাৎ এরিকা কার্কের ২০২৭ সালের প্রস্তাব, রাষ্ট্রপক্ষের ২০২৮ সালের প্রস্তাব এবং প্রতিরক্ষা দলের ২০২৯ সালের সম্ভাব্য সময়সূচির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। এই তিনটি প্রস্তাবই আদালতের বিবেচনাধীন; কোনোটিকেই এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চার্লি কার্ক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিচিত মুখ এবং টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ নামের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ইউটাহ ভ্যালি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচারপ্রক্রিয়া দেশটির সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। এই হত্যার ঘটনায় টাইলার রবিনসনের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো গুরুতর হত্যাকাণ্ড। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবে অভিযোগ আনা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। রবিনসনের আইনজীবীরা সব অভিযোগে নিজেদের মক্কেলের নির্দোষ দাবি আদালতে জানিয়েছেন। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষকে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে এবং প্রতিরক্ষা দলকে সেসব প্রমাণ যাচাই ও চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দিতে হবে। এরিকা কার্কের আবেদনের মূল বক্তব্য শুধু দ্রুত বিচার শুরু করার দাবি নয়; বরং নিহত ব্যক্তির পরিবারের অধিকারকে বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান। তাঁর আইনজীবীরা ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের অধিকারসংক্রান্ত আইনের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, অযৌক্তিক বিলম্ব ছাড়া মামলার নিষ্পত্তি পাওয়া ভুক্তভোগী পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। দীর্ঘসূত্রতা পরিবারটির মানসিক চাপ বাড়াতে পারে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে দ্রুত বিচার চাওয়ার অর্থ এই নয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায্য বিচারের অধিকার সীমিত করা উচিত। প্রতিরক্ষা দলের যুক্তির পেছনেও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা রয়েছে এমন মামলায় সাধারণত তদন্ত ও প্রস্তুতির পরিধি বিস্তৃত হয়। রাষ্ট্রপক্ষকে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ সাজাতে হয়, আর প্রতিরক্ষা দলকে সেই প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করতে হয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ও বিপক্ষে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ, বিশেষজ্ঞদের মতামত যাচাই এবং বিচারকমণ্ডলী নির্বাচনের জন্যও সময় দরকার হতে পারে। তাই কেবল দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না। তবে প্রতিরক্ষা দলের চাওয়া সময় সত্যিই প্রয়োজনীয় কি না, সেটিও আদালতের বিবেচনার বিষয়। কী পরিমাণ তথ্যপ্রমাণ এখনো যাচাই করা বাকি, কোন কোন আইনি আবেদন করা হবে, সেগুলো নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগতে পারে এবং বিচার কত দিন চলবে—এসব বিষয়ের ব্যাখ্যা আদালত চাইতে পারে। এরিকা কার্কের আইনজীবীরা তুলনীয় অন্যান্য হত্যার মামলার উদাহরণ দিয়ে দীর্ঘ বিলম্বের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, চার বছর ধরে বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে থাকলে সরকারি অর্থের ওপরও বড় ধরনের চাপ পড়তে পারে। বিচারককে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হতে পারে। মামলাটি নিয়ে ব্যাপক সংবাদ প্রচার ও জনমত তৈরি হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য বিচারকদের মধ্যে কতজন নিরপেক্ষভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণ শুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তা যাচাই করা জরুরি হতে পারে। প্রতিরক্ষা দল মামলাটি অন্য কোনো বিচারিক এলাকায় স্থানান্তরের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্থানান্তরের আবেদন করা হলে সেটিরও আলাদা আইনি বিবেচনা প্রয়োজন হবে। এ ধরনের পদক্ষেপ মামলার সময়সূচিতে প্রভাব ফেলতে পারে, যদিও স্থানান্তর হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এখানে চার্লি কার্কের পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মৃত্যুর সময় তাঁদের দুই সন্তানের বয়স ছিল যথাক্রমে তিন বছর ও এক বছর। এরিকা কার্কের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দিয়েছেন, ২০২৯ সাল পর্যন্ত বিচার পিছিয়ে গেলে সন্তানদের শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য সময় বাবার মৃত্যুর বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষার মধ্যে কেটে যাবে। পরিবারের দৃষ্টিতে, দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার শুধু আইনি নিষ্পত্তির বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিশ্চয়তার অবসানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে পরিবারের এই প্রত্যাশা পূরণের পথ নির্ধারণ করতে গিয়ে আদালতকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকারও রক্ষা করতে হবে। মামলাটির পরবর্তী অগ্রগতির জন্য ২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবরের শুনানি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ওই শুনানিতে বিচারক দুই পক্ষের প্রস্তাবিত সময়সূচি, বিচার শুরুর সম্ভাব্য তারিখ, প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় এবং বিচার কত দিন চলতে পারে—এসব বিষয় বিবেচনা করবেন বলে আদালতের নির্দেশের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে শুনানি থেকেই চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। আদালত প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে সময়সূচিতে পরিবর্তনও আনতে পারে।