২৮১১ কোটি টাকা খরচের পরও বিআরটি বাতিল, ভাঙতে লাগবে আরও ৪৫ কোটি
১৪ বছর ধরে নির্মাণের পর চালু হলো না বিশেষ বাসসেবা। এবার স্টেশন ও সড়ক বিভাজক সরিয়ে ছয় লেনের মহাসড়ক তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
ঢাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত দ্রুত গণপরিবহন চালুর লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণে এবার ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পরও নির্ধারিত বিশেষ বাসসেবা চালু করতে না পারায় প্রকল্পটি বাতিল করে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে নতুন করে অবকাঠামো ভাঙতে যেমন অর্থ ব্যয় হবে, তেমনি প্রকল্পে আগে ব্যয় করা বিপুল অর্থের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২১ অক্টোবর প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে নির্মিত বিআরটি স্টেশন, আলাদা বাস চলাচলের লেনের বিভাজক এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সরিয়ে নেওয়া হবে। এরপর সড়কের দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয়টি লেনের সাধারণ মহাসড়ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণের জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক প্রশস্ত করার জন্য আরও ২৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রস্তাবিত অপসারণ ও সড়ক প্রশস্তকরণের ব্যয় মিলিয়ে প্রয়োজন হতে পারে ৭২ কোটি টাকা। তবে এই অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাবকে চূড়ান্ত বরাদ্দ বা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, বিআরটি স্টেশনগুলো নির্মাণে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। ভেঙে ফেলার পর উদ্ধার করা বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে প্রায় সাত কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। ফলে স্টেশন নির্মাণে ব্যয় করা অর্থের তুলনায় উদ্ধার করা সামগ্রীর সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য অনেক কম। তবে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করতে হলে অবকাঠামোর অবচয়, উদ্ধারযোগ্য সামগ্রীর মূল্য এবং অপসারণের চূড়ান্ত ব্যয়সহ সব হিসাব বিবেচনা করতে হবে।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। উদ্দেশ্য ছিল, সড়কের নির্দিষ্ট লেন দিয়ে বিশেষ বাস চালিয়ে যাত্রীদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। এতে যানজট কমার পাশাপাশি রাজধানীর সঙ্গে গাজীপুর এবং আশপাশের এলাকার যোগাযোগ সহজ হওয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সালে যাত্রী পরিবহন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই সময়সূচি রক্ষা করা যায়নি।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় দুই হাজার ৩৯ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা সংশোধনের মাধ্যমে অনুমোদিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, অনুমোদিত ব্যয়ের বড় একটি অংশ খরচ হলেও প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অনুযায়ী বিশেষায়িত বাসসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন স্থানান্তর, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার মতো বিষয় উঠে এসেছে। নির্মাণকাজ চলাকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে গাজীপুর, টঙ্গী, উত্তরা ও বিমানবন্দরমুখী যাত্রীদের দীর্ঘদিন ধরে যানজট ও যাতায়াতের ভোগান্তি সহ্য করতে হয়েছে। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এই সড়কে পণ্য পরিবহনেও বাড়তি সময় ও ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পটির বড় দুর্বলতাগুলোর একটি ছিল বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা। প্রথমে স্বয়ংক্রিয় দরজাযুক্ত দীর্ঘ বাস চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেলচালিত বাস কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বাস সংগ্রহ করা যায়নি।
স্টেশনগুলোর নকশা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রচলিত বাসের দরজা বাম পাশে থাকলেও বিআরটি স্টেশনগুলো তৈরি করা হয়েছিল ডান পাশে দরজাবিশিষ্ট বিশেষ বাসের কথা বিবেচনায় রেখে। ফলে বিশেষ বাস চালু করা হলেও বিদ্যমান গণপরিবহনের সঙ্গে যাত্রী ওঠানামা ও সংযোগের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
নতুন পরিকল্পনায় প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি দুই লেনের উড়ালপথকে চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগও রয়েছে। পাশাপাশি বিআরটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসির কার্যক্রম বন্ধ করে এর দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে অবকাঠামো অপসারণ, সড়ক পুনর্বিন্যাস এবং সংশ্লিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে।
প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। একাংশের মতে, দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা, বাড়তি ব্যয় এবং বিশেষ বাসসেবা চালুর অনিশ্চয়তা বিবেচনায় সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা বাস্তবসম্মত হতে পারে। অন্যদিকে, প্রকল্প বাতিলের আগে এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বিকল্প গণপরিবহন এবং আর্থিক ক্ষতির বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন।
বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন শুধু অবকাঠামো ভাঙার সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আগের ব্যয়ের হিসাব কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, নতুন করে ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং ঢাকা-গাজীপুর সড়কে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রকল্পটির অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের বড় অবকাঠামো পরিকল্পনায় সঠিক নকশা, বাস্তবসম্মত সময়সীমা, পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।





