রাশিয়ার ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলায় ইউক্রেনকে স্টারলিংক দিতে ট্রাম্পকে আহ্বান আইনপ্রণেতাদের
রাশিয়ার অভ্যন্তরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থায় হামলার সক্ষমতা বাড়াতে ইউক্রেনকে স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ দিতে ট্রাম্প ও ইলন মাস্কের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দুই দলের প্রায় দুই ডজন মার্কিন আইনপ্রণেতা।
মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের ২৩ জন আইনপ্রণেতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তিনি যেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ককে ইউক্রেনের জন্য রাশিয়ার অভ্যন্তরে স্টারলিংক ব্যবহারের অনুমতি দিতে বলেন। তাঁদের লক্ষ্য, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা শনাক্ত করতে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো। গত ২১ অক্টোবর পাঠানো একটি চিঠির বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য হিল এ তথ্য জানিয়েছে। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের আইনপ্রণেতারা। তাঁদের বক্তব্য, ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় শুধু প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে হামলার উৎসও লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। তবে এই আহ্বান এখনো অনুমোদন বা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নয়।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ২৩ জনের মধ্যে সাতজন রিপাবলিকান এবং ১৬ জন ডেমোক্র্যাট রয়েছেন। রিপাবলিকানদের মধ্যে আছেন জো উইলসন, ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক, ডন বেকন, ম্যাক্স মিলার, কার্লোস গিমেনেজ, জেফ হার্ড ও অ্যান্ডি হ্যারিস। তাঁদের কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। দুই দলের সদস্যদের একসঙ্গে এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়া থেকে বোঝা যায়, ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াশিংটনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এই চিঠিকে মার্কিন কংগ্রেসের সব সদস্যের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আইনপ্রণেতারা চিঠিতে বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং প্রাণহানি কমানো সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাঁদের মতে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখনো রক্তপাত বন্ধ করার মতো অবস্থান নেননি। তাই ইউক্রেনকে এমন সক্ষমতা দেওয়া দরকার, যাতে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার উৎস শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়। তাঁদের যুক্তি, এক ফোনকলের মাধ্যমে ট্রাম্প এই উদ্যোগ এগিয়ে নিতে পারেন। এতে ইউক্রেনের মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি পুতিনের ওপর আলোচনায় বসার চাপও বাড়তে পারে। তবে রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলার অনুমতি দেওয়া হলে যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এ বিষয়টিও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে স্টারলিংক নামের উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স পরিচালিত এই ব্যবস্থায় পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা বহু উপগ্রহের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকায় যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। ইউক্রেন যুদ্ধে এটি সেনাদের মধ্যে যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান এবং চালকবিহীন আকাশযানের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে কিংবা বৈদ্যুতিন সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি হলে উপগ্রহনির্ভর সংযোগ কার্যকর হতে পারে। তবে স্টারলিংক নিজে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকারী ব্যবস্থা নয়। এর মাধ্যমে সামরিক যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া সম্ভব হলেও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং হামলার সিদ্ধান্তের জন্য অন্যান্য তথ্য ও প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের হামলা মোকাবিলায় তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের স্থান শনাক্ত করতে পারলে হামলার আগেই সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে উৎক্ষেপণব্যবস্থা, সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের ওপর আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও কিয়েভের বিবেচনায় রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে উপগ্রহ সংযোগের অনুমতি, গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভুলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সামরিক ব্যবহারের শর্তের ওপর।
এর আগে চলতি বছরের আগস্টে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য স্টারলিংক-সংযুক্ত আকাশযান ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল বলে আইরিশ টাইমস জানিয়েছিল। সে সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়টি তুলেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়। তবে ট্রাম্প তখন এই পরিকল্পনার প্রতি স্পষ্ট সমর্থন জানাননি। ফলে অক্টোবরের নতুন চিঠিটি আগের প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে স্টারলিংকের সামরিক ব্যবহারে সাম্প্রতিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিতর্কের কারণে। রয়টার্সের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্টারলিংকের কয়েকটি সেবায় সীমা আরোপের ফলে ইউক্রেনের কিছু সামরিক আকাশযানের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল বলে দেশটির কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন। বিশেষ করে দ্রুতগতিতে চলার সময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে কিছু অভিযান বাতিল করতে হয় এবং আকাশ প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহৃত চালকবিহীন যান পরিচালনায় সমস্যা দেখা যায় ।
২০ অক্টোবর প্রকাশিত ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্টারলিংকের সামরিক ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সেবার গতি কমানোর নির্দেশ মাস্ক দিয়েছিলেন বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে। পরদিন রয়টার্স জানায়, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইউক্রেনের স্টারলিংক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত স্পেসএক্স ও মাস্কের ওপর নির্ভর করে। তবে এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের ভূমিকা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। তাই সীমাবদ্ধতা আরোপের নির্দেশ কে দিয়েছিলেন এবং সিদ্ধান্তটি কীভাবে কার্যকর হয়েছিল, তা নিয়ে এখনো সব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে নতুন চিঠিটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে: ইউক্রেনকে আত্মরক্ষার জন্য কতটা প্রযুক্তিগত ও সামরিক সহায়তা দেওয়া উচিত, এবং সেই সহায়তার সীমা কোথায় নির্ধারিত হবে? একদিকে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তি রয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার ভেতরে আরও বিস্তৃত হামলার অনুমতি যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়াতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত উপগ্রহ যোগাযোগব্যবস্থার ওপর যুদ্ধক্ষেত্রের নির্ভরতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
এখন পর্যন্ত আইনপ্রণেতাদের চিঠির পর ট্রাম্প বা মাস্ক ইউক্রেনকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে স্টারলিংক ব্যবহারের নতুন অনুমতি দিয়েছেন এমন নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, স্পেসএক্সের নীতিমালা এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বৃহত্তর কৌশলের ওপর। একই সঙ্গে এই উদ্যোগের ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের সক্ষমতা বাড়বে, নাকি সংঘাত আরও তীব্র হবে সেটিও আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে।





