কানসাসে ফুটবল মাঠে উঠে গেল গাড়ি, প্রাণ গেল শিশু ও এক প্রাপ্তবয়স্কের
৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের উইচিটা শহরে শিশুদের ফুটবল খেলা চলার সময় মাঠে গাড়ি উঠে এক শিশু ও এক প্রাপ্তবয়স্ক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন। শনিবার, ১৭ অক্টোবর বিকেলে শহরের স্ট্রাইকার ক্রীড়া কমপ্লেক্সে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, গাড়ির চালককে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে গাড়িটি কীভাবে মাঠে উঠে পড়ল, কেন এই ঘটনা ঘটল এবং চালক ইচ্ছাকৃতভাবে লোকজনের ওপর গাড়ি চালিয়েছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কেডব্লিউসিএইচ, বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ঘটনার মূল তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের উদ্দেশ্য, চালকের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য অভিযোগ সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি কর্তৃপক্ষ। ফলে ঘটনাটিকে আপাতত একটি প্রাণঘাতী যানবাহন দুর্ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা গেলেও, এটিকে নিশ্চিতভাবে পরিকল্পিত হামলা বলা যাচ্ছে না। পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, নিহত দুজনের একজন ছয় বছর বয়সী শিশু এবং অন্যজন ৩৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। তাঁরা দুজনই কানসাসের ম্যাকফারসন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত দুজনের মধ্যে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক ছিল না। তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের আগে স্বজনদের অবহিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় পুলিশ, দমকল বাহিনী ও জরুরি চিকিৎসাসেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। আহতদের উদ্ধার করে আশপাশের হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহতদের মধ্যে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়েই রয়েছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহতদের মধ্যে পাঁচজন শিশু, যাদের বয়স পাঁচ থেকে নয় বছরের মধ্যে। প্রাপ্তবয়স্ক আহতদের বয়স ২৮ থেকে ৬৮ বছরের মধ্যে। আহতদের সবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের আঘাত গুরুতর ছিল।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শনিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটের দিকে সেডজউইক কাউন্টির জরুরি নম্বরে একের পর এক ফোন আসতে থাকে। ফোনকারীরা জানান, একটি গাড়ি ফুটবল খেলার মাঠের ভেতর দিয়ে চলে গেছে এবং এতে একাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। খবর পেয়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জরুরি সেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি কালো রঙের পিকআপ ট্রাক যুব ফুটবলের মাঠের ওপর দিয়ে এগিয়ে যায় এবং একাধিক ব্যক্তিকে ধাক্কা দেয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য অনুসারে, গাড়িটি মাঠের ভেতর বেশ কিছু দূর এগিয়ে যাওয়ার পর থামে। তবে গাড়িটির সঠিক গতি কত ছিল, চালক কখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন এবং মাঠে প্রবেশের আগে কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য চূড়ান্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
উইচিটা পুলিশ বিভাগের ক্যাপ্টেন অ্যারন মোসেস সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি ঘটনাটিকে একটি মর্মান্তিক পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জানান, চালক পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই চালকের কাছ থেকে জনসাধারণের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে আর কোনো হুমকি নেই। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের পরবর্তী হালনাগাদ প্রতিবেদনে চালক সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, চালক ৩৪ বছর বয়সী একজন নারী এবং তিনি গার্ডেন সিটির বাসিন্দা। গাড়িতে তাঁর সঙ্গে আরও দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ছিল। তবে ওই শিশুদের বর্তমান অবস্থা ও তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, চালকের নিজের একটি সন্তান ওই ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ফুটবল খেলছিল। তবে যে মাঠে প্রাণঘাতী ঘটনাটি ঘটেছে, সেই মাঠে ওই সন্তান খেলছিল না। চালকের বৈধ গাড়ি চালানোর অনুমতিপত্র ছিল বলেও পুলিশ জানিয়েছে। এসব তথ্য তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো থেকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তদন্তকারীরা এখন মূলত জানতে চাইছেন, গাড়িটি কীভাবে খেলার মাঠে প্রবেশ করল এবং চালক কী পরিস্থিতিতে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারালেন বা মাঠের দিকে গাড়ি চালালেন। এটি অসাবধানতাজনিত দুর্ঘটনা, যান্ত্রিক ত্রুটি, ভুলবশত মাঠে প্রবেশ, নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, তা এখনো তদন্তাধীন। চালকের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ আনা হবে, সে সম্পর্কেও চূড়ান্ত ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর পুলিশ প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ভিডিও ফুটেজ চেয়েছে। আশপাশে থাকা কারও মুঠোফোনে ধারণ করা দৃশ্য, গাড়ির চলাচলের ভিডিও অথবা ঘটনার আগে ও পরের কোনো তথ্য তদন্তে সহায়তা করতে পারে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ফুটেজে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আছে বলে মনে না হলেও তা তদন্তকারীদের কাছে জমা দেওয়া যেতে পারে। এ জন্য উইচিটা পুলিশ বিভাগ একটি নির্দিষ্ট অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভিডিও গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।
কর্তৃপক্ষের আহ্বান, যাঁদের কাছে ঘটনার ভিডিও বা প্রাসঙ্গিক তথ্য রয়েছে, তাঁরা যেন তদন্তকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্থানীয় পুলিশ বিভাগ ৩১৬-২৬৮-৪৪০৭ নম্বরে তদন্ত শাখার সঙ্গে এবং ৩১৬-২৬৭-২১১১ নম্বরে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধ জানিয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে ৯১১ নম্বরে ফোন করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার প্রভাব পড়েছে ক্রীড়া কমপ্লেক্সের অন্যান্য আয়োজনেও। শনিবার সেখানে যুব ফুটবলের পাশাপাশি পাশের একটি মাঠে স্কুল পর্যায়ের পতাকা ফুটবল প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। কানসাসের স্কুল ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই দিনের বাকি খেলাগুলো বাতিল করা হয়েছে। পাশের মাঠে অংশ নেওয়া দলগুলোর কোনো খেলোয়াড় এই ঘটনায় আহত হয়েছেন কি না, তা প্রাথমিক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা যায়নি।
শহর কর্তৃপক্ষও ক্রীড়া কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত সব আয়োজন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তদন্ত চলাকালে ২৯তম স্ট্রিট ও গ্রিনউইচ এলাকার আশপাশ এড়িয়ে চলতে চালকদের অনুরোধ করা হয়েছে। এতে জরুরি সেবার কর্মীদের চলাচল এবং তদন্তের কাজ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উইচিটা শহরের মেয়র লিলি উ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবার, বিশেষ করে শিশুদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান। একটি শিশু-কেন্দ্রিক ক্রীড়া আয়োজনে এমন প্রাণহানির ঘটনা স্থানীয় পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিশুদের খেলাধুলার মাঠ সাধারণত পরিবার, খেলোয়াড় ও দর্শকদের মিলনস্থল। এমন স্থানে যানবাহন উঠে প্রাণহানি ঘটলে মাঠের নিরাপত্তা, প্রবেশপথের নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা এবং দর্শকদের সুরক্ষা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ক্রীড়া কমপ্লেক্সের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট ত্রুটি ছিল বলে দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
ঘটনাটির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নিহতের সংখ্যা দুই—এক শিশু ও একজন প্রাপ্তবয়স্ক। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহত হয়ে ১১ জন হাসপাতালে গেছেন। তৃতীয়ত, পুলিশ চালককে হেফাজতে নিয়েছে এবং গাড়িতে আরও দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ছিল বলে জানিয়েছে। চতুর্থত, ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশ এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। এসব তথ্য একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো দাবি, অনুমান বা প্রত্যক্ষদর্শীর অসম্পূর্ণ বর্ণনাকে তদন্তের চূড়ান্ত ফল হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না। বিশেষ করে চালক ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে আঘাত করেছেন এমন দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য তদন্তের ফল, প্রমাণ এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন। একইভাবে, ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল বলেও এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।