ওবামার মন্তব্যে ক্ষুব্ধ নেতানিয়াহু, ইসরায়েলের ভূমি নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক
ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি নিয়ে বারাক ওবামার মন্তব্যের জবাবে নিজেদের ঐতিহাসিক ভূমির অধিকার তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ওবামার মন্তব্যে ক্ষুব্ধ নেতানিয়াহু, ইসরায়েলের ভূমি নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক
৭ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ নিয়ে করা মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেছেন, ইহুদিরা নিজেদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে কোনো বিদেশি দখলদার নয়। তাঁর দাবি, ইহুদি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার নিয়ে ইসরায়েল কোনো আপস করবে না। নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে পুরোনো বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। ওবামা ইসরায়েলের নিরাপত্তার অধিকার অস্বীকার করেননি; বরং তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা একটি রাষ্ট্রেরও ফিলিস্তিনিদের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দায়িত্ব রয়েছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু মনে করেন, ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ঘটনার সূত্রপাত উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে ওবামার একটি আলোচনা অনুষ্ঠান থেকে। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর সেখানে আইরিশ লেখক ও সাংবাদিক সুসান ম্যাককের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় বেলফাস্টের একটি মিলনায়তনে, যেখানে প্রায় সাত হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ওই আলোচনায় ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি সরকারের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন ওবামা। ওবামার বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ইহুদিরা ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন নিপীড়ন, বৈষম্য ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ কারণে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূখণ্ডের সঙ্গে তাঁদের ঐতিহাসিক সম্পর্কও রয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা ভূমি হারিয়েছেন এবং অনেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ফলে তাঁদের মধ্যে অন্যায়বোধ তৈরি হওয়া এবং নিজেদের হারানো ভূমি ফিরে পাওয়ার দাবি তোলা অস্বাভাবিক নয়।
ওবামা বলেন, কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে যে সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিতে এগিয়ে থাকার কারণে তারা যা ইচ্ছা করতে পারে এবং অন্য পক্ষের সঙ্গে কোনো ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তাহলে সেই অবস্থান সাময়িকভাবে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে নৈতিক অবস্থান দুর্বল করে দিতে পারে। তাঁর মতে, ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে প্রায় ৭০ লাখ ফিলিস্তিনির অস্তিত্ব ও অধিকার উপেক্ষা করে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ওবামার বক্তব্যের পর শুক্রবার ভিডিওবার্তায় প্রতিক্রিয়া জানান নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইহুদি জনগোষ্ঠী তাদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে কোনো বিদেশি দখলদার নয়। তাঁর ভাষায়, ইহুদিদের ইতিহাস কোনো উপনিবেশ স্থাপনের প্রকল্প নয় এবং তাঁদের ভূমি চুরি করা ভূমি নয়। তিনি আরও বলেন, এই ভূখণ্ডই তাঁদের মাতৃভূমি এবং হাজার বছর ধরে ইহুদিদের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। নেতানিয়াহু বিশেষভাবে ‘জুদিয়া’ নামটি উল্লেখ করেন। ঐতিহাসিকভাবে জুদিয়া প্রাচীন ইহুদি ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অঞ্চল। বর্তমানে এই নামটি ইসরায়েলের রাজনৈতিক আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইসরায়েলি রাজনীতির একটি অংশ পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলকে ‘জুদিয়া ও সামারিয়া’ বলে উল্লেখ করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক আলোচনায় অঞ্চলটি সাধারণত অধিকৃত পশ্চিম তীর হিসেবে পরিচিত। এই নামের ব্যবহারও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মাত্রাকে সামনে নিয়ে আসে। নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, শান্তির পথে বাধা ইসরায়েল নয়। তাঁর দাবি, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা ইহুদিদের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার স্বীকার করতে চায় না। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা শান্তি টেকসই হবে না। ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার এবং নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন। তবে দুই নেতার বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ওবামা ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান সময়ে তাঁদের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু ইহুদি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে এনেছেন। ফলে বিতর্কটি শুধু অতীতের ইতিহাস নিয়ে নয়; বরং বর্তমান ভূখণ্ডের অধিকার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুত মানুষের ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধান নিয়েও। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বুঝতে হলে ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা, ১৯৪৮ সালের যুদ্ধ এবং সেই সময়ের ব্যাপক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতির বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র ও একটি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। জেরুজালেমের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রস্তাবও ছিল। ইহুদি নেতৃত্ব পরিকল্পনাটি গ্রহণ করলেও আরব নেতৃত্ব তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর সংঘাত তীব্র হয় এবং ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়। ওই যুদ্ধের সময় সাত লাখের বেশি ফিলিস্তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হন অথবা নিজেদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হন বলে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ও ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে ‘নাকবা’ নামে স্মরণ করেন, যার অর্থ বিপর্যয়। বহু ফিলিস্তিনি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছে। তাঁদের একটি বড় অংশ নিজেদের পূর্বপুরুষের বাড়িঘরে ফেরার অধিকার দাবি করে আসছে।
অন্যদিকে ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা ছিল দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, ইউরোপে ইহুদিবিদ্বেষ এবং হলোকাস্টের পর নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইহুদি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আধুনিক ইহুদি জাতীয়তাবাদও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই ইতিহাসের একদিকে রয়েছে ইহুদিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের ভূমি হারানো, বাস্তুচ্যুতি এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপূর্ণ দাবি। একটি দিককে স্বীকার করার জন্য অন্য দিকের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা অস্বীকার করা প্রয়োজন হয় না।
বর্তমান বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরের অবস্থান। ওই যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা উপত্যকাসহ একাধিক ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তী সময়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বৈধতা না থাকার কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েল এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নয় এবং নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক অধিকারের যুক্তি তুলে ধরে।
গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গও ওবামার বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পর ইসরায়েলের সামরিক অভিযান গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক সংকট সৃষ্টি করে। ওবামা তাঁর আলোচনায় ৭ অক্টোবরের হামলারও সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, হামাসের ওই হামলা ফিলিস্তিনিদের জন্য অর্থবহ রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের নৈতিক ও মানবিক পরিণতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া শুধু ওবামার ব্যক্তিগত বক্তব্যের জবাব নয়; এটি ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং ঐতিহাসিক বয়ান পুনর্ব্যক্ত করারও একটি প্রচেষ্টা। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ইহুদি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের হুমকিকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে রেখেছেন। ওবামা আবার তাঁর বক্তব্যে সামরিক শক্তির পাশাপাশি নৈতিক দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক ছাড় এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক সম্পর্কের পুরোনো মতপার্থক্যও স্মরণ করিয়ে দেয়।
ফ্যাক্ট যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, নেতানিয়াহু ১৬ অক্টোবর ভিডিওবার্তা প্রকাশ করেছেন এবং ওবামার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন—এ তথ্য একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ওবামা ১৩ অক্টোবর বেলফাস্টে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি এবং ইসরায়েল সরকারের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে মন্তব্য করেছেন—এ তথ্যও সংবাদপ্রতিবেদনে সমর্থিত। তৃতীয়ত, নেতানিয়াহুর বক্তব্য যে ইহুদিরা তাঁদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে বিদেশি দখলদার নন, সেটি তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দাবি; একে নিরপেক্ষভাবে প্রমাণিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। একইভাবে, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও ভূমি হারানোর বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে নথিবদ্ধ ঘটনা। তবে প্রতিটি নির্দিষ্ট এলাকার মালিকানা, বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতি এবং বর্তমান আইনি অবস্থার মূল্যায়নে আলাদা তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন।