ব্রেকিং
যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে চারজনকে হত্যা, মায়ের কেনা বন্দুক নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্নযুক্তরাষ্ট্রে ২০২৭ সালের অভিবাসন লটারি চালুর নির্দেশ দিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল বিচারকওবামার মন্তব্যে ক্ষুব্ধ নেতানিয়াহু, ইসরায়েলের ভূমি নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কডিসেম্বরের মায়ামি সম্মেলনে জেলেনস্কি-ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের সম্ভাবনা, এখনো সম্মতি দেয়নি ওয়াশিংটন-মস্কোকুইন্সে পাঁচ বছরের মেয়ের মৃত্যু, হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত মা বিনা জামিনে আটক

নিজের মেয়েদের স্কুলে গুলিবর্ষণ, হামলাকারীকে থামিয়ে নায়ক বাবার

দুই মেয়ের স্কুলে বন্দুকধারীর হামলা দেখে জীবনের ঝুঁকি নেন কাইলুব জিয়ামানকো, তবে চারজনের মৃত্যু তাঁকে গভীর মানসিক যন্ত্রণায় ফেলেছে।

নিজের মেয়েদের স্কুলে গুলিবর্ষণ, হামলাকারীকে থামিয়ে নায়ক বাবার
নিজের মেয়েদের স্কুলে গুলিবর্ষণ, হামলাকারীকে থামিয়ে নায়ক বাবার

যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের বেন্ড শহরে নিজের দুই মেয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্দুকধারীর হামলার খবর পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে থামাতে এগিয়ে যান ৩৬ বছর বয়সী বাবা কাইলুব জিয়ামানকো। তাঁর সাহসী পদক্ষেপে হামলাকারীর তাণ্ডব থামে। তবে এই ভয়াবহ ঘটনায় তিন শিশু ও একজন শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত হয়েছে আরও এক শিশু ও একজন শিক্ষক। হামলাকারীও নিহত হয়েছে। ঘটনার পর জিয়ামানকোর পরিবার জানিয়েছে, তিনি মানুষের প্রশংসা বা পরিচিতি চান না; বরং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ধকল সামলাতে চান।
১৫ অক্টোবর দুপুরে বেন্ড শহরের সিলভার রেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষার্থী গ্রিফিন জে. জন দ্বিতীয় একটি বন্দুক নিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে গুলি চালায়। হামলার সময় বিদ্যালয়ে বহু শিশু ও শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন শিশুদের একটি শ্রেণিকক্ষকে লক্ষ্য করে হামলাকারী গুলি চালায় বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বিদ্যালয়ের বাইরে। পুলিশি বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারী প্রথমে একটি বেড়া অতিক্রম করে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। তার কাছে ছিল গুলি চালানোর উপযোগী একটি বন্দুক। এরপর সে একটি লাল রঙের গাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গাড়িটির চালক গুলিবিদ্ধ না হলেও গাড়িতে একাধিক গুলি লাগে। পরে তিনি সেখান থেকে সরে গিয়ে জরুরি নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।
ওই সময় কাছাকাছি অবস্থানে ছিলেন কাইলুব জিয়ামানকো। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি ও নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত। বিদ্যালয়টির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল গভীর, কারণ তাঁর দুই মেয়েই সেখানে পড়াশোনা করে। বন্দুকধারীকে বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন। এরপর তিনি নিজের গাড়ি থামিয়ে হামলাকারীর পিছু নেন।
পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, হামলাকারী বিদ্যালয়ের একটি বন্ধ দরজার কাচ ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর সে একটি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে গুলি চালাতে শুরু করে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জীবন চরম বিপদের মুখে পড়ে। গুলির শব্দ শুনে আশপাশের কক্ষের শিক্ষক ও শিশুরা আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। কেউ টেবিলের নিচে আশ্রয় নেয়, কেউ দরজা বন্ধ করে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করে।

এই সময় শ্রেণিকক্ষে থাকা এক শিক্ষিকা হামলাকারীকে থামানোর চেষ্টা করেন। পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের বিবরণ অনুসারে, তিনি প্রথমে নিজের মুঠোফোনটি হামলাকারীর দিকে ছুড়ে মারেন। এরপর তাঁর সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। বন্দুকধারীর কাছ থেকে অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে তিনি নিজের জীবনও বিপন্ন করেন। তাঁর এই প্রতিরোধ অন্যদের রক্ষা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় তৈরি করে বলে পুলিশ মনে করছে।
জিয়ামানকো বিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে ওই শিক্ষিকাকে হামলাকারীর সঙ্গে লড়াই করতে দেখেন। পরিস্থিতি বুঝে তিনি নিজের বৈধভাবে বহন করা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলাকারীকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। এতে ১৬ বছর বয়সী হামলাকারী নিহত হয়। পুলিশ জানিয়েছে, হামলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের পৌঁছানোর সময় হামলাকারী ইতিমধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল।

বেন্ড পুলিশের প্রধান মাইক ক্রান্টজ হামলার সময় শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিপদের মুখে অন্যদের রক্ষার জন্য এগিয়ে আসা ব্যক্তিদের সাহসকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে শিক্ষিকার প্রতিরোধ এবং জিয়ামানকোর দ্রুত সিদ্ধান্ত আরও প্রাণহানি ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে ঠিক কতজনের জীবন রক্ষা পেয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

এই হামলায় পাঁচ বছর বয়সী, আট বছর বয়সী ও ১১ বছর বয়সী তিন শিশুর মৃত্যু হয়। নিহত শিক্ষিকার নাম মেগান ল্যামবার্ট; তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, শিক্ষকতা ছিল তাঁর স্বপ্নের পেশা। শিশুদের প্রতি ভালোবাসা এবং বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সহকর্মী, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর শোক ছড়িয়ে পড়ে।

এ ছাড়া সাত বছর বয়সী এক শিশু এবং ৫৪ বছর বয়সী আরেক শিক্ষক গুরুতর আহত হন। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদে তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার কথা জানানো হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রকাশিত হলে তা দিয়ে পরিস্থিতির হালনাগাদ চিত্র পাওয়া যাবে।

ঘটনার পর জিয়ামানকোর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি জনসমক্ষে পরিচিতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন না। বরং উদ্ধারকর্মী, বিদ্যালয়ের কর্মী এবং পাশে দাঁড়ানো স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চান। তাঁর মা কেন্ডা ফ্রিম্যান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ছেলের অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। হামলাকারীকে থামাতে পারলেও সব শিশুকে বাঁচাতে না পারার বিষয়টি তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে।
মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর জিয়ামানকো তাঁকে ফোন করে জানান যে তিনি হামলাকারীকে গুলি করেছেন। এরপর তাঁর মা তাঁকে সাহসী বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, তিনি অন্যদের রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন মনে করেছেন, তা করেছেন। তবে জিয়ামানকোর নিজের প্রতিক্রিয়ায় একটি গভীর মানসিক দ্বন্দ্বের চিত্র উঠে এসেছে। তিনি মনে করছেন, আরও বেশি মানুষকে বাঁচাতে না পারার কষ্ট তাঁকে তাড়া করছে। এই তথ্য পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে; তাঁর নিজের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

পরিবারটি এখন ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রাখতে চাইছে। তাদের বক্তব্য, এই কঠিন সময়ে জিয়ামানকো, তাঁর স্ত্রী এবং দুই মেয়ের একসঙ্গে সময় কাটানো প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যরা সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকার দেওয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে জনসমক্ষে প্রশংসা বাড়লেও মানসিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সময় প্রয়োজন হতে পারে।

এই অভিজ্ঞতার পর পরিবারটির সহায়তায় অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু অনলাইনে অনুদান সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো মানসিক আঘাত থেকে সেরে ওঠার জন্য পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা, কাজ থেকে বিরতি নেওয়ার কারণে আয় কমে গেলে দৈনন্দিন ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় পেশাগত সহায়তার খরচ মেটানো। তবে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগের তথ্যকে পরিবারের পক্ষ থেকে সব অনুদান যাচাই করা হয়েছে—এমন দাবি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
এদিকে বেন্ড শহরের বাসিন্দারা নিহত শিশু ও শিক্ষিকার স্মরণে বিদ্যালয়ের বাইরে ফুল, বেলুন ও খেলনা রেখে যাচ্ছেন। শোকসভা ও স্মরণানুষ্ঠানে স্থানীয় মানুষ অংশ নিচ্ছেন। একটি বিদ্যালয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা এই সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি নিরাপত্তা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং স্কুলে প্রতিদিনের জীবন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তদন্তকারীরা হামলাকারীর উদ্দেশ্য এবং কীভাবে সে অস্ত্র পেয়েছিল, তা খতিয়ে দেখছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহৃত বন্দুকটি তার মা কিনেছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে অস্ত্রটি তার হাতে কীভাবে পৌঁছেছিল এবং হামলার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিয়ামানকোকে বীর হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে এই প্রশংসার পাশাপাশি নিহত শিশুদের পরিবারগুলোর শোক এবং আহতদের সুস্থ হয়ে ওঠার বিষয়টি সামনে রাখা জরুরি। একজন ব্যক্তির সাহসী পদক্ষেপকে স্বীকৃতি দেওয়া যায়, কিন্তু সেই স্বীকৃতি যেন প্রাণহানির গভীরতা আড়াল না করে।

তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মূল ঘটনাটি—বিদ্যালয়ে গুলিবর্ষণ, চারজনের মৃত্যু, দুজনের গুরুতর আহত হওয়া এবং জিয়ামানকোর হামলাকারীকে গুলি করে থামানো—পুলিশের প্রকাশিত তথ্য ও একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলে যায়। একই সঙ্গে শিক্ষিকার প্রতিরোধের বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে। তবে জিয়ামানকোর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য তাঁর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যনির্ভর; তাঁকে চিকিৎসাগতভাবে কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত বলা যায় না। হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না।
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, একজন বাবা নিজের মেয়েদের স্কুলে অন্য শিশুদের রক্ষার জন্য এগিয়ে গেলেও সব প্রাণ বাঁচাতে পারেননি। তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা চলছে, কিন্তু তাঁর পরিবার এখন শোক, ভয় ও মানসিক ধকল সামলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। বেন্ড শহরের মানুষের কাছে তাই এই ঘটনা একই সঙ্গে সাহসের, শোকের এবং বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার এক কঠিন স্মৃতি হয়ে থাকবে।


ট্যাগ: কাইলুব জিয়ামানকোওরেগনযুক্তরাষ্ট্রস্কুলে গুলিবর্ষণসিলভার রেল প্রাথমিক বিদ্যালয়শিশু নিহতশিক্ষিকা নিহতবিদ্যালয়ের নিরাপত্তাবন্দুক হামলাবেন্ড শহরমানসিক আঘাতপুলিশি তদন্ত

প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।