ট্রাম্পের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে, পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংসের ঘোষণা
৭ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কেনটাকি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দেশটির পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কতটা মিল রয়েছে, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, পরমাণু স্থাপনাগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। ১৭ অক্টোবর কেনটাকির হাইল্যান্ড হাইটসে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ট্রাম্প রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির দাম এবং তাঁর প্রশাসনের সামরিক সাফল্য নিয়ে বক্তব্য দেন। যুক্তরাষ্ট্রের আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এই সমাবেশের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের জন্য ভোটারদের সমর্থন নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং যুদ্ধ আর দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তিনি অভিযানটিকে ছোট পরিসরের উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ইরানের পরমাণু সক্ষমতা কার্যত অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়সীমা নির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশ্বাসকে এখনই নিশ্চিত শান্তিচুক্তি বা সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প এর আগেও একাধিকবার যুদ্ধ শিগগির শেষ হওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁর প্রশাসনের বক্তব্য, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি এবং কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি বিবেচনা করলে যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি এখনো অনিশ্চিত। চলতি বছরের অক্টোবরেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত অবসানের আলোচনা পুরোপুরি সফল হয়নি। ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবকে অপর্যাপ্ত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের ভিত্তিতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময় অনুমান করা যায় না। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের দাবির সত্যতা যাচাই করতে হলে ২০২৫ সালের জুনে দেশটির পরমাণু স্থাপনায় হামলার ঘটনা বিবেচনায় নিতে হবে। সে সময় ইসরায়েল প্রথমে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় আঘাত হানে। এসব হামলায় নাতাঞ্জ ও ফোরদোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত হয় বলে বিভিন্ন মূল্যায়নে উঠে এসেছে। তবে স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং একটি দেশের সম্পূর্ণ পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা শুরু করে। এরপর সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় এবং যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জ্বালানি বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা ঠেকানোকে সামরিক পদক্ষেপের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পর্যবেক্ষণ এবং ইউরেনিয়ামের মজুতসংক্রান্ত মূল্যায়ন থেকে। রয়টার্সের ৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের হামলার আগে ইরানের কাছে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল বলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা হিসাব করেছিল। অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধতার মাত্রা সাধারণত প্রায় ৯০ শতাংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকলেই কোনো দেশের হাতে প্রস্তুত পরমাণু বোমা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অস্ত্র তৈরির জন্য আরও প্রযুক্তিগত ধাপ, বিশেষায়িত ব্যবস্থা এবং উপাদান প্রয়োজন। আরও বড় সমস্যা হলো, হামলার পর ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কতটা অক্ষত রয়েছে এবং সেগুলো বর্তমানে কোথায় আছে, তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে স্বাভাবিক পরিদর্শন কার্যক্রম চালাতে পারেনি। ইরানও মজুত ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সব প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়নি। ফলে পরমাণু কর্মসূচির বাস্তব অবস্থা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটির পরমাণু সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে বলে নিশ্চিত ঘোষণা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত স্বাধীন যাচাইযোগ্য তথ্য নেই। এখানে ফ্যাক্ট যাচাইয়ের ফলাফল স্পষ্ট। ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে—এ তথ্য সমর্থিত। কিন্তু দেশটির সব পরমাণু সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, কিংবা ভবিষ্যতে কোনোভাবেই পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শন সীমিত থাকায় ইউরেনিয়ামের মজুত ও অবশিষ্ট সক্ষমতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তাই ট্রাম্পের বক্তব্যকে সামরিক সাফল্য সম্পর্কে তাঁর প্রশাসনের দাবি হিসেবে দেখা উচিত, স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।
পরমাণু কর্মসূচি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে রয়েছে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সামাল দেওয়ার প্রশ্ন। সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি, বিমানভ্রমণ ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। প্রতিবেদনে যুদ্ধের আগের তুলনায় পেট্রলের দাম ৪৫ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ৬৮ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ব্যয়বৃদ্ধি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
ট্রাম্প অবশ্য দাবি করছেন, যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম দ্রুত কমে আসবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংঘাতের অবসান হলে মার্কিন অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরবে। কিন্তু জ্বালানির দাম কেবল যুদ্ধ বন্ধের ওপর নির্ভর করে না; আন্তর্জাতিক সরবরাহ, তেলের উৎপাদন, পরিবহনব্যবস্থা এবং বাজারের প্রত্যাশাও এতে প্রভাব ফেলে। তাই যুদ্ধ শেষ হলেই সব পণ্যের দাম দ্রুত কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। সেখানে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও পড়তে পারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং পণ্য উৎপাদনের খরচ আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কূটনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে এবং ভবিষ্যতে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে এগোবে না—এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেবে। অন্যদিকে ইউরেনিয়ামের মজুত, সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও অক্টোবরে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার আলোচনায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা কমানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সামরিক হামলা চালিয়ে যাওয়া কিংবা কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো—কোন পথ শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হবে, তা নির্ভর করছে দুই দেশের সিদ্ধান্তের ওপর। সামরিকভাবে কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, যাচাইযোগ্য চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশের পরমাণু সক্ষমতা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন।
নির্বাচনী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি দিক রয়েছে। নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের জন্য অর্থনীতি ও নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে এবং এর ফলে জ্বালানির দাম কমবে—এমন বার্তা দিয়ে ট্রাম্প ভোটারদের আশ্বস্ত করতে চাইছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের প্রশাসনের সামরিক সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছেন। তবে যুদ্ধের ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং সংঘাতের দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তাঁর দলের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের বক্তব্যে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার আশাবাদ এবং ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি উঠে এসেছে। কিন্তু যুদ্ধের সমাপ্তি, পরমাণু উপাদানের বর্তমান অবস্থা এবং ইরানের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা সম্পর্কে এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক পরিদর্শন, যাচাইযোগ্য তথ্য এবং কার্যকর কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তাঁর দাবির সবটুকু নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না। আপাতত সবচেয়ে সতর্ক মূল্যায়ন হলো, ইরানের পরমাণু অবকাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে, কিন্তু দেশটির অবশিষ্ট সক্ষমতা ও যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।