ব্রেকিং
ডিসেম্বরের মায়ামি সম্মেলনে জেলেনস্কি-ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের সম্ভাবনা, এখনো সম্মতি দেয়নি ওয়াশিংটন-মস্কোকুইন্সে পাঁচ বছরের মেয়ের মৃত্যু, হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত মা বিনা জামিনে আটকফরাসি মেয়রকে পিটিয়ে আহত, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি ফ্রান্সেরবাদ পড়া ভোটে পাল্টে গেল হিসাব, মিশিগানে নতুন মেয়র বাংলাদেশি মুহিত মাহমুদযুক্তরাষ্ট্রে ছাঁটাই কমলেও নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হচ্ছে, নিয়োগের ধীরগতিতে কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

গুগল এখন তাঁর কথায় চলে, প্রথম মেয়াদের সঙ্গে তুলনা টেনে আলোচনায় ট্রাম্প

প্রথম মেয়াদে গুগল তাঁর ফোন ধরত না বলে দাবি ট্রাম্পের, দ্বিতীয় মেয়াদে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিকে নিজের ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরলেন তিনি।

গুগল এখন তাঁর কথায় চলে, প্রথম মেয়াদের সঙ্গে তুলনা টেনে আলোচনায় ট্রাম্প
গুগল এখন তাঁর কথায় চলে, প্রথম মেয়াদের সঙ্গে তুলনা টেনে আলোচনায় ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাঁর প্রথম মেয়াদে গুগল তাঁর ফোন ধরতেও রাজি ছিল না, অথচ দ্বিতীয় মেয়াদে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন গুগল তাঁর কথায় চলে—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এখন তাঁকে খুশি করতে ব্যস্ত। মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ করার সিদ্ধান্তকে নিজের রাজনৈতিক প্রভাবের উদাহরণ হিসেবেও তুলে ধরেন তিনি। ১৭ অক্টোবর কেনটাকির হাইল্যান্ড হাইটসে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে দেওয়া তাঁর বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে বক্তব্যের ভাষা, নাম পরিবর্তনের বাস্তবতা এবং গুগলের ভূমিকা—এই তিনটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল অংশটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাবেশে তিনি বলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি প্রথমে মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তোলেন। এরপর গুগলকে নিয়ে মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, প্রথম মেয়াদে গুগল তাঁর ফোন ধরত না, কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানটির আচরণ পাল্টে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উদ্ধৃতিতে ‘গুগল ম্যাপসকে ফোন করেছিলাম’ কথাটি ব্যবহার করা হলেও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত মূল বক্তব্যের সঙ্গে সেটির পুরোপুরি মিল নেই। ফলে ভাইরাল উদ্ধৃতিকে হুবহু বক্তব্য হিসেবে প্রচার না করে মূল প্রতিবেদনের ভাষা অনুসরণ করাই যুক্তিসংগত।

এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের নেওয়া একটি নির্বাহী সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন, ২০ জানুয়ারি, তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের নির্দেশসংবলিত একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। আদেশটির উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথি, মানচিত্র ও সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থায় জলভাগটির নাম ‘আমেরিকা উপসাগর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক নাম নির্ধারণকারী সংস্থাগুলো পরবর্তী সময়ে এই পরিবর্তন বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ভূস্থানিক গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, সরকারি ভৌগোলিক নামের তথ্যভান্ডারেও নতুন নামটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, নাম পরিবর্তনের বিষয়টি কেবল ট্রাম্পের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবস্থাতেও এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটেছিল।

গুগল ম্যাপসে নাম পরিবর্তনের ঘটনাটিও যাচাই করে দেখা গেছে। গুগল ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে নিজেদের প্রকাশিত ব্যাখ্যায় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ভৌগোলিক নামের তথ্যভান্ডারে পরিবর্তন আসার পর তারা মানচিত্রে নতুন নাম দেখানোর কাজ শুরু করেছে। পরদিন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গুগল ম্যাপস ব্যবহারকারীরা জলভাগটিকে ‘আমেরিকা উপসাগর’ নামে দেখতে শুরু করেন। তবে সব দেশের ব্যবহারকারীর জন্য একই নাম দেখানো হয়নি। মেক্সিকোতে ব্যবহারকারীরা ‘মেক্সিকো উপসাগর’ নামটিই দেখতে থাকেন। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ব্যবহারকারীদের কাছে দুই নামই দেখানো হয়। গুগলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ব্যবহারকারীর দেশ বা অঞ্চলের অবস্থানের ভিত্তিতে মানচিত্রে প্রদর্শিত নাম নির্ধারিত হয়।

এখানেই বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে গুগলের আচরণ পরিবর্তনের বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, গুগলের নিজস্ব ব্যাখ্যায় নাম পরিবর্তনের কারণ হিসেবে সরকারি তথ্যভান্ডারের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ভৌগোলিক নামের তথ্যভান্ডারে সংশোধন আনার পর সেই অনুযায়ী মানচিত্র হালনাগাদ করা হয়েছে। ফলে গুগল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ফোন পেয়েছিল কি না, কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত নির্দেশে নাম বদলেছে কি না—এসব বিষয়ে প্রকাশিত বক্তব্য থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রমাণ পাওয়া যায় না। যাচাইযোগ্য তথ্য হলো, সরকারি নামের পরিবর্তনের পর গুগল তাদের মানচিত্রে সেই পরিবর্তন কার্যকর করেছে।

আরও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে কোনো ভৌগোলিক নাম পরিবর্তন করা মানেই পুরো বিশ্বের কাছে সেই নাম বাধ্যতামূলক হয়ে যাওয়া নয়। মেক্সিকো উপসাগর যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কিউবার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলভাগ। এর উপকূল, সামুদ্রিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন ও মৎস্যসম্পদ একাধিক দেশের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব সরকারি নথি ও ব্যবস্থায় নতুন নাম গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু এর ফলে অন্য দেশগুলোর নামকরণের রীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যায় না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নাম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। ২০২৫ সালে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নামটির পরিবর্তে নতুন নাম গ্রহণ না করার কারণে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়েছিল।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের আরেকটি দিক হলো, তিনি নাম পরিবর্তনের ঘটনাকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেননি; বরং নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতা ও প্রভাবের নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরেছেন। সমাবেশে তিনি বলেন, প্রথম মেয়াদে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হতো বলে মনে করেন না। তাঁর ভাষায়, বর্তমান মেয়াদে তিনি এমন কিছু করতে পারছেন, যা আগে করা সম্ভব ছিল না। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সমর্থকদের সামনে নিজের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন আদায়ও ছিল ওই সমাবেশের উদ্দেশ্য।
সমাবেশে ট্রাম্প কানাডার অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি বলেন, হ্রদটির নামও তিনি ‘আমেরিকা হ্রদ’ করেছেন। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের পর গুগল ম্যাপসে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের জন্য অন্টারিও হ্রদের নাম ‘আমেরিকা হ্রদ’ হিসেবে দেখানো শুরু হয়। তবে কানাডায় ব্যবহারকারীরা ‘অন্টারিও হ্রদ’ নামটিই দেখতে থাকেন, আর অন্য অঞ্চলে দুই নাম দেখানো হয়। কানাডার বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিনিধি এই নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছেন। ফলে এটি কেবল মানচিত্রের নাম বদলের ঘটনা নয়; প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
এই ধরনের নাম পরিবর্তনের রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও এর ব্যবহারিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একই জলভাগের জন্য বিভিন্ন দেশে আলাদা নাম ব্যবহৃত হলে সংবাদ প্রতিবেদন, শিক্ষা উপকরণ, নৌপরিবহনসংক্রান্ত নথি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মানচিত্রভিত্তিক প্রযুক্তি যখন ব্যবহারকারীর অবস্থান অনুসারে ভিন্ন নাম দেখায়, তখন একই স্থানের পরিচয় বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদাভাবে উপস্থাপিত হয়। তবে শুধু নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে জলসীমা, মালিকানা বা আন্তর্জাতিক সীমানা বদলে যায় না। ২০২৫ সালের একটি তথ্য যাচাই প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছিল, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ জলভাগটির নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেও তা নিজে থেকে সামুদ্রিক সীমানা পরিবর্তন করে না।

তাহলে ভাইরাল বক্তব্যটির সত্যতা কী? যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের গুগলকে নিয়ে মন্তব্য করার ঘটনা সত্য এবং মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও বাস্তব। গুগল ম্যাপসে নতুন নাম প্রদর্শনের বিষয়টিও প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ঘোষণায় নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু ‘গুগল এখন তাঁর কথায় চলে’—এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য ও আত্মপ্রচারের অংশ, গুগলের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কোনো স্বীকারোক্তি নয়। একইভাবে, ‘গুগল ম্যাপসকে ফোন করেছিলাম’ এমন ভাষায় ছড়িয়ে পড়া উদ্ধৃতিকে মূল বক্তব্যের হুবহু প্রতিলিপি বলা ঠিক হবে না। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্যের ভাষা কিছুটা আলাদা।


ট্যাগ: ডোনাল্ড ট্রাম্পযুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিগুগল ম্যাপসআমেরিকা উপসাগরমেক্সিকো উপসাগরতথ্য যাচাইআন্তর্জাতিক সংবাদভৌগোলিক নাম পরিবর্তন

প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।