ব্রেকিং
ফরাসি মেয়রকে পিটিয়ে আহত, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি ফ্রান্সেরবাদ পড়া ভোটে পাল্টে গেল হিসাব, মিশিগানে নতুন মেয়র বাংলাদেশি মুহিত মাহমুদযুক্তরাষ্ট্রে ছাঁটাই কমলেও নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হচ্ছে, নিয়োগের ধীরগতিতে কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগযুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ এলাকায় সাশ্রয়ী ভাড়াবাসন রক্ষায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগমুসলিমদের ‘মোহাম্মদ’ নাম নিয়ে ট্রাম্পের কটাক্ষ, নতুন করে বিতর্ক

ফরাসি মেয়রকে পিটিয়ে আহত, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি ফ্রান্সের

অধিকৃত পশ্চিম তীরের তাইবেহ গ্রামে ফরাসি মেয়রকে মারধরের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্যারিস। অভিযুক্ত বসতি স্থাপনকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ফরাসি মেয়রকে পিটিয়ে আহত, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি ফ্রান্সের
ফরাসি মেয়রকে পিটিয়ে আহত, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি ফ্রান্সের

ফ্রান্সের এক মেয়রকে মারধরের ঘটনায় ইসরায়েল সরকারের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছে ফ্রান্স। অধিকৃত পশ্চিম তীরের তাইবেহ গ্রামে সফররত ফরাসি মেয়র বের্নার বোদুকে মুখোশধারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা মারধর করেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ ঘটনার পর ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছেন। গত ১৭ অক্টোবরের এই হামলার ঘটনা ইউরোপীয় কূটনীতিকদের নিরাপত্তা, ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতা এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে
ছবি: তাইবেহ গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও উত্তেজনার সংবাদচিত্র। ছবিটি প্রকাশের আগে ঘটনার সঙ্গে এর তারিখ ও পরিচয় মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
ঘটনাটি ঘটেছে ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত গ্রাম তাইবেহতে। গ্রামটি রামাল্লাহর পূর্ব দিকে অবস্থিত। ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক বসতি হিসেবে পরিচিত এই গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ এবং জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা গিয়েছিলেন। ওই প্রতিনিধিদলে ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ধর্মীয় নেতারাও ছিলেন। সফরের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগও যুক্ত ছিল। কিন্তু সেই সফরই শেষ পর্যন্ত সহিংস হামলার ঘটনায় পরিণত হয়।

পোল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের ওপর এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে হামলাকারীরা বিশেষভাবে পোলিশ প্রতিনিধিদের লক্ষ্য করেছিল কি না, সে বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পুরো প্রতিনিধিদল হামলার মুখে পড়লেও প্রত্যেক ব্যক্তিকে একই উদ্দেশ্যে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এবং তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনাই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ হয়ে উঠেছে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষও ঘটনাটির প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার হামলাকে সহিংসতার গুরুতর ঘটনা হিসেবে নিন্দা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সফরকারী প্রতিনিধিদল কেন আগে থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সফরের সমন্বয় করেনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগে থেকে সমন্বয় করা হলে সফরকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হতে পারত। তবে সফরের আগে সমন্বয় করা হয়নি—এমন দাবি হামলার দায় বা হামলাকারীদের পরিচয় নির্ধারণের বিকল্প হতে পারে না। নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কোনো ব্যক্তির ওপর শারীরিক হামলা বৈধ হয়ে যায় না।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ঘটনাটিকে গুরুতর সহিংসতা বলে বর্ণনা করেছে। তবে তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সফরটি আগে থেকে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি এবং হামলার সময় ঘটনাস্থলে কোনো সেনাসদস্য উপস্থিত ছিলেন না। ইসরায়েলি পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া এবং সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে হামলার জন্য কাউকে গ্রেপ্তারের নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি। সুতরাং হামলাকারীরা শনাক্ত হয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে—এমন কোনো দাবি এখনই নিশ্চিতভাবে করা যাচ্ছে না।
এই হামলার পটভূমিতে রয়েছে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করে আসছেন, তাঁদের জমি, বাড়িঘর, কৃষিজমি এবং চলাচলের নিরাপত্তা বারবার হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে কৃষকদের ওপর হামলা, গাছপালা নষ্ট করা, যানবাহনে আগুন দেওয়া এবং কৃষিকাজে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে। জলপাই ফিলিস্তিনের বহু পরিবারের জীবিকা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই ফসল সংগ্রহে বাধা দেওয়া বা কৃষকদের ওপর হামলা তাঁদের আয়ের পাশাপাশি সামাজিক জীবনেও প্রভাব ফেলে।

পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি শুধু বিচ্ছিন্ন হামলার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে ভূমি, বসতি সম্প্রসারণ, দখলদারত্ব এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারও জড়িত। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অধিকৃত ভূখণ্ডে বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা দখলদার শক্তির দায়িত্ব। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে অবৈধ বলে বিবেচিত। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক আলোচনায় এ বিষয়টি বহুবার উঠে এসেছে। তবে নির্দিষ্ট হামলার অপরাধী শনাক্ত করা, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনগতভাবে দোষ প্রমাণ করা পৃথক প্রক্রিয়া। কোনো অভিযোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব যত বড়ই হোক, তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
তাইবেহর ঘটনায় ফরাসি মেয়রের বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। হামলার পর তিনি অভিযোগ করেন, বসতি স্থাপনকারীদের এমন আচরণ ইসরায়েলি সরকারের সহনশীলতার পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং পুলিশি তদন্তের কথা বলেছেন। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ভিডিও প্রমাণ কীভাবে যাচাই করা হয় এবং সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।

ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও ভবিষ্যতে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। বেলজিয়াম ইতিমধ্যে সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলেছে। ফ্রান্সের বক্তব্যেও গ্রেপ্তার, বিচার এবং বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এসব আহ্বানের পর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে কিংবা ইসরায়েল সরকারের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নতুন শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য এই ঘটনার প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলোতে নিশ্চিত করা হয়নি। কূটনৈতিক নিন্দা এবং বাস্তব নীতিগত পদক্ষেপ এক বিষয় নয়; পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম চলছে এবং কৃষক ও গ্রামীণ সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ সময় কৃষিজমিতে প্রবেশ, ফসল সংগ্রহ এবং নিজেদের জমিতে নিরাপদে কাজ করার অধিকার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সহিংসতা চলতে থাকলে কৃষকেরা শুধু শারীরিক ঝুঁকিতেই পড়বেন না, তাঁদের ফসল নষ্ট হওয়া, আয় কমে যাওয়া এবং পরবর্তী মৌসুমে জমিতে যেতে ভয় পাওয়ার মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিকাজ নির্বিঘ্নে চালানোর পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে তাইবেহতে ফরাসি মেয়র বের্নার বোদুর ওপর হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন, বেলজিয়াম ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ইসরায়েলি পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হামলার জন্য কাউকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তদন্তের ফল, অভিযুক্তদের পরিচয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনগত পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই ঘটনার পর দায়বদ্ধতা কতটা নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষক, বিদেশি কূটনীতিক, সাংবাদিক ও অন্যান্য বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয় কি না, সেদিকেও আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে।

ট্যাগ: ফ্রান্সজ্যঁ-নোয়েল বারোবের্নার বোদুইসরায়েলফিলিস্তিনপশ্চিম তীরতাইবেহবসতি স্থাপনকারীকূটনৈতিক হামলাআন্তর্জাতিক আইনজলপাই সংগ্রহইউরোপীয় ইউনিয়ন

প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।