টাইগ্রেতে ছয় মাসের অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করল ইথিওপিয়া, এরপর নির্বাচন
সংঘাতের পর টাইগ্রে অঞ্চলে ছয় মাসের অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করেছে ইথিওপিয়া। শান্তি ফিরিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং অবাধ নির্বাচন আয়োজনই নতুন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় টাইগ্রে অঞ্চলে ছয় মাসের জন্য অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠনের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের কার্যালয় থেকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। নতুন প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব হবে অঞ্চলটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন, সরকারি ও সামাজিক পরিষেবা সচল করা এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে অবাধ ও স্বচ্ছ আঞ্চলিক নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ তৈরি করা।
ইথিওপিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও এএফপির প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তের কথা উঠে এসেছে। দেশটির সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন প্রশাসনের মাধ্যমে টাইগ্রে অঞ্চলে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করা হবে। তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অবস্থানের ওপর।
টাইগ্রে অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। গত ২৩ সেপ্টেম্বর টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের (টিপিএলএফ) নেতৃত্বাধীন বাহিনী কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর জবাবে ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান চালায়। কয়েক দিনের লড়াইয়ের পর সরকারি বাহিনী ও তাদের সমর্থিত যোদ্ধারা অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে শুরু করে। ৪ অক্টোবর আঞ্চলিক রাজধানী মেকেলের নিয়ন্ত্রণও সরকারি পক্ষের হাতে চলে যায়। এই সামরিক পরিবর্তনের পর টাইগ্রের প্রশাসনিক কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় সরকার।
নতুন অন্তর্বর্তী প্রশাসন ছয় মাসের জন্য দায়িত্ব পালন করবে। এ সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিষেবা চালু করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সংঘাতের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়া মানুষদের নিরাপদে নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করাও প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে।
নতুন প্রশাসনের নেতৃত্ব ও বিভিন্ন দায়িত্বে পাঁচজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রশাসন ও সরকারি পরিষেবাবিষয়ক প্রধান নির্বাহী আসেফা আব্রাহা হাগোস, অর্থনীতি ও পুনর্গঠনবিষয়ক প্রধান নির্বাহী ডা. তেওদ্রোস আরেগায়ে ওল্ডেসেলাসি, শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক প্রধান নির্বাহী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গেব্রে এগজিয়াবের বেয়েনে হাইলু এবং রাজনৈতিক বিষয় ও জনসম্পৃক্ততাবিষয়ক প্রধান নির্বাহী রেদায়ে হালেফোম ওল্ডেসেলাসি। এ ছাড়া আঞ্চলিক রাজধানী মেকেলের মেয়র হিসেবে ডা. শিশায় আমারেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী প্রশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। এর দায়িত্ব মূলত দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা এবং নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। নির্বাচিত আঞ্চলিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। তবে নতুন প্রশাসনের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের এই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টাইগ্রে অঞ্চলের সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। ২০২০ সালে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ও টিপিএলএফের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। ২০২২ সালের শান্তিচুক্তির মাধ্যমে বড় ধরনের লড়াই বন্ধ হলেও বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন, নিরাপত্তা, নিরস্ত্রীকরণ এবং আঞ্চলিক ক্ষমতা নিয়ে নানা সমস্যা অমীমাংসিত থেকে যায়। নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই সংকট আবারও গভীর হয়েছে। আগের যুদ্ধের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছিল।
এদিকে ইথিওপিয়া ও প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার মধ্যেও উত্তেজনা বেড়েছে। ইথিওপিয়ার সরকার অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়া টিপিএলএফকে সহায়তা করছে। তবে ইরিত্রিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়লে আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও দুই পক্ষকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
নতুন অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠনের মাধ্যমে টাইগ্রেতে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ তৈরি করতে চাইছে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার। তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্দশা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার কারণে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। আগামী ছয় মাসের মধ্যে অবাধ নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয় কি না এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা স্বাভাবিকতা ফিরে আসে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।





