পারমাণবিক অস্ত্র কমাতে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নতুন আলোচনার কথা জানালেন ট্রাম্প
পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি কমাতে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প, তবে এখনো কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
বিশ্বের প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর অস্ত্রভান্ডার কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে সামরিক প্রতিযোগিতা এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে আলোচনার বিস্তারিত শর্ত, সম্ভাব্য সময়সীমা কিংবা কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, সম্ভব হলে তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ও মজুত কমাতে চান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে তাঁর কথা হয়েছে। তবে চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই সর্বশেষ বক্তব্যের পর আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ট্রাম্পের মন্তব্যকে সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু একে চূড়ান্ত সমঝোতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ও সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যায় রাশিয়া এগিয়ে, এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। তবে মোতায়েন করা পারমাণবিক ওয়ারহেডের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার চেয়ে এগিয়ে। এসব অস্ত্রের বিপুল ধ্বংসক্ষমতার কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব শুধু ওই দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে চীন পারমাণবিক সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এটি ট্রাম্পের নিজস্ব মূল্যায়ন, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। তবে দেশটির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে সামরিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং দেশটির নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
এই আলোচনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র সীমিত রাখার সর্বশেষ প্রধান চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া। নতুন কৌশলগত অস্ত্র হ্রাস চুক্তি নামে পরিচিত নিউ স্টার্ট চুক্তিটি ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এর মেয়াদ পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো হয়। চুক্তিটি ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। এর ফলে দুই দেশের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার ওপর আগের চুক্তিভিত্তিক সীমা আর কার্যকর নেই।
চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক বছরের জন্য নির্ধারিত সীমা মেনে চলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তাঁর প্রশাসন পুরোনো চুক্তি কেবল বাড়ানোর পরিবর্তে আরও আধুনিক ও বিস্তৃত নতুন চুক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছে। নতুন কোনো চুক্তি হলে তাতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া নয়, চীনের পারমাণবিক সক্ষমতাকেও কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
চীনকে আলোচনায় যুক্ত করা অবশ্য সহজ হবে না। এর আগে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে একই কাঠামোয় পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। চীনের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার তাদের নিজেদের তুলনায় অনেক বড়। তাই বৃহৎ অস্ত্রভান্ডার থাকা দেশগুলোর আগে নিজেদের অস্ত্র কমানোর বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে চীন দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে। ফলে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর চীন কী অবস্থান নেয়, তা ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা কমানোর প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। কোন ধরনের অস্ত্র কমানো হবে, কত সময়ের মধ্যে কমানো হবে, কীভাবে তা যাচাই করা হবে এবং কোনো দেশ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ও নির্ধারণ করতে হয়। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র, বোমারু বিমান, সাবমেরিন এবং অন্যান্য কৌশলগত অস্ত্রের বিষয়গুলোও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হলো অস্ত্র প্রতিযোগিতা সীমিত করা, ভুল হিসাব থেকে সৃষ্ট সংঘাতের ঝুঁকি কমানো এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধ করা। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে কার্যকর সমঝোতা হলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক সংঘাত এ ধরনের উদ্যোগকে জটিল করে তুলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের বক্তব্য একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত দিলেও এর বাস্তব অগ্রগতি এখনো স্পষ্ট নয়। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আলোচনা কোন পর্যায়ে রয়েছে, কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে কি না এবং আলোচনার জন্য কী ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই বিষয়টির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর বিষয়ে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়ে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা সামনে এনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার বা তিন দেশ অস্ত্র কমানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর খবর নেই। তাই এই উদ্যোগ কতটা বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করে, তা বুঝতে পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের দিকে নজর রাখা জরুরি।





