লন্ডনের রাস্তায় অচেতন আমিরাতের রাজপরিবারের নারী, পাশে ঝুঁকিতে তিন বছরের শিশু
লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেল আমিরাতের রাজপরিবারের সদস্য মেহরা আল নাহিয়ানকে। পাশে ছিল খালি পায়ে ঘুরে বেড়ানো তিন বছরের এক শিশু। ঘটনায় আদালতে শিশুর প্রতি অবহেলার অভিযোগ স্বীকার করেছেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের পশ্চিমাঞ্চলে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে যুক্ত ৩২ বছর বয়সী মেহরা আল নাহিয়ান। তাঁর কাছেই জুতা ছাড়া অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল তিন বছর বয়সী একটি শিশু। শিশুটি ব্যস্ত সড়কের কাছাকাছি থাকায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পথচারীরা এগিয়ে এসে শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং পুলিশকে খবর দেন। ঘটনাটি ঘটে ২০২৬ সালের ১৩ জুন। সম্প্রতি লন্ডনের আদালতে শিশুর প্রতি অবহেলার অভিযোগে দোষ স্বীকার করার পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন দুপুরে পশ্চিম লন্ডনের একটি সড়কের পাশে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে অচেতন অবস্থায় ছিলেন মেহরা। তাঁর কাছাকাছি আরেক ব্যক্তিকেও অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় তিন বছরের শিশুটি জুতা ছাড়া অবস্থায় একটি স্কুটার নিয়ে খেলছিল। শিশুটির অবস্থান ছিল চলন্ত যানবাহনের কাছাকাছি। পরিস্থিতি দেখে আশপাশের লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁরা শিশুটির দেখাশোনার দায়িত্ব নেন এবং জরুরি সহায়তার জন্য পুলিশকে খবর দেন।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত পথচারীরা শিশুটিকে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করেন। মেহরা প্রায় ৩০ মিনিট অচেতন অবস্থায় ছিলেন বলে আদালতে জানানো হয়। পরে তাঁর জ্ঞান ফিরলে তিনি অসংলগ্ন আচরণ করেন বলে শুনানিতে উল্লেখ করা হয়। আদালতকে আরও জানানো হয়, একপর্যায়ে শিশুটি কাগজের একটি টুকরোর পেছনে ছুটতে গিয়ে রাস্তার দিকে চলে যাচ্ছিল। তখন একজন পথচারী দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে আটকে দেন।
মামলার শুনানিতে বিচারক বলেন, অপরিচিত মানুষজন এগিয়ে না এলে শিশুটি গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হতে পারত। ব্যস্ত সড়কে শিশুটির একা ঘোরাফেরা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সে হারিয়ে যেতে পারত কিংবা অপরিচিত কারও দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছিল।
ঘটনার সঙ্গে মাদক সেবনের বিষয়টিও আদালতে উঠে আসে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার আগের দিনগুলোতে মেহরা কোকেন সেবন করেছিলেন। পুলিশ তাঁর ব্যাগে মাদক সেবনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সরঞ্জাম পায়। তবে তল্লাশিতে কোনো অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়নি বলে আদালতে জানানো হয়।
মেহরার আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, ঘটনার দিন তিনি কোকেন সেবন করেননি। আগের দিনগুলোতে মাদক গ্রহণের কারণে তিনি প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে আইনজীবী ব্যাখ্যা দেন। তাঁর পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, ঘটনার পর তিনি মাদকাসক্তি থেকে সেরে ওঠার জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। তাই ঘটনার দিনই তিনি কোকেন সেবন করেছিলেন—এমন বক্তব্যকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
মেহরা আল নাহিয়ান সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির শাসক রাজপরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে যুক্ত। তবে আদালতের মামলায় তাঁর রাজপরিবারের পরিচয়ের চেয়ে শিশুর নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুটি যখন ব্যস্ত সড়কের কাছে একা ঘুরছিল, তখন তিনি নিজেই অচেতন অবস্থায় ছিলেন।
সম্প্রতি লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে মেহরা শিশুর প্রতি অবহেলার একটি অভিযোগ স্বীকার করেন। আদালত তাঁকে দুই বছরের কমিউনিটি অর্ডার দেন, যার আওতায় তাঁকে পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে। পাশাপাশি তাঁকে পাঁচ হাজার পাউন্ড জরিমানা এবং এক হাজার পাউন্ড মামলার খরচ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তাঁর পরিশোধযোগ্য অর্থের পরিমাণ ছয় হাজার পাউন্ড।
আদালতে তাঁর আইনজীবী জানান, মেহরা ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সারেতে অবস্থিত প্রিয়রি চিকিৎসাকেন্দ্রে মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি পুনর্বাসন কর্মসূচি সম্পন্ন করতে চান এবং পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করেছেন। আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজের ভুলের জন্য মেহরা অনুতপ্ত এবং মাদকাসক্তি কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ঘটনাটি শিশুদের নিরাপত্তা ও অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে কোনো শিশুর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি যদি অচেতন হয়ে পড়েন, তাহলে শিশুটি কতটা বিপদের মুখে পড়তে পারে, তা এই ঘটনা স্পষ্ট করেছে। পথচারীদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে শিশুটি সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা পায়।
আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শেষ হয়েছে। তবে ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অবহেলার কারণে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, শিশুর প্রতি দায়িত্ব পালনের বিষয়টি আইনের চোখে গুরুত্বপূর্ণ।





