নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে হেনস্তা, ক্ষোভে ফুঁসছেন সাবেক সরকারের ১২ উপদেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ১২ উপদেষ্টা, বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন অপপ্রচার ও হুমকি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে স্লোগান ও মৌখিক আক্রমণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তাঁর সরকারের ১২ জন সাবেক উপদেষ্টা। একই সঙ্গে ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে বিষয়টি তোলার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও চেয়েছে ঢাকা।
সোমবার, ১২ অক্টোবর নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে ঘিরে কয়েকজনের স্লোগান দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, হুইলচেয়ারে থাকা ড. ইউনূসের কাছে কয়েকজন এগিয়ে এসে উচ্চস্বরে কথা বলছেন। তাঁদের ‘আপনি এখানে কেন এসেছেন’ এবং ‘আপনি সন্ত্রাসী’—এ ধরনের বক্তব্য দিতে শোনা যায়। তাঁরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও তাঁর ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ তোলেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওটি প্রায় এক মিনিট পাঁচ সেকেন্ডের। তবে ভিডিও প্রকাশের সময় পর্যন্ত ঘটনার নির্দিষ্ট সময় ও পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভিডিওতে দৃশ্যমান ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অভিযোগকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ১২ জন উপদেষ্টা যৌথ বিবৃতিতে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে হয়রানি, অনলাইনে অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত হুমকির অভিযোগের নিন্দা জানান। তাঁরা বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁকে লক্ষ্য করে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে এবং শারীরিকভাবে আঘাত করার হুমকি দিচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সি আর আবরার, আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন, ফারুক-ই-আজম, ফরিদা আখতার, শারমীন এস মুরশিদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
সাবেক উপদেষ্টারা তাঁদের বিবৃতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তাঁদের ভাষ্য, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, মানবাধিকার রক্ষা এবং অতীতের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা কাজ করেছিলেন।
তাঁরা আরও বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর সংস্কার ও মানবাধিকারের অঙ্গীকার অব্যাহত থাকা উচিত। তাঁদের মতে, ভয়ভীতি, অনলাইনে হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত হুমকি দিয়ে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উঠে আসা সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা মুছে ফেলা যাবে না।
ড. ইউনূসকে বিমানবন্দরে হেনস্তার ঘটনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিন্দা জানিয়েছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে এবং যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের মিশনকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি বিবৃতিতে ঘটনায় জড়িতদের সঙ্গে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এ সংশ্লিষ্টতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার আগে অভিযোগটিকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, ড. ইউনূসের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে বিষয়টি জোরালোভাবে তোলা হবে বলেও তিনি জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক হয়রানির শিকার হলে সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ড. ইউনূসের দায়িত্ব পালন ও তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু সেই সমালোচনা যেন হয়রানি বা হুমকিতে রূপ না নেয়।
বিমানবন্দরের ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধ এবং বিদেশে রাজনৈতিক প্রতিবাদের সীমা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে ড. ইউনূসের সাবেক সহকর্মী ও সরকার ঘটনাটিকে হয়রানি হিসেবে দেখছে এবং আইনগত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকারও গণতান্ত্রিক সমাজে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও কোনো ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে আঘাত করার হুমকি, বেআইনি বাধা কিংবা সহিংস আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বিমানবন্দরের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফল বা জড়িত সবার বিরুদ্ধে গৃহীত চূড়ান্ত আইনি ব্যবস্থার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনার পেছনে কারা ছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় কী এবং কোনো আইন ভঙ্গ হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
ড. ইউনূসকে ঘিরে এই ঘটনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগেও গুরুত্ব পেয়েছে। এখন নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত, বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তার দিকে।





