কৃষ্ণসাগরে ড্রোন হামলায় জাহাজডুবি, ১১ নাবিক নিখোঁজ, বুলগেরিয়ায় বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলায় একটি ডুবে গেছে, ১১ নাবিক নিখোঁজ; আরেকটির সবাই উদ্ধার হয়েছেন।
কৃষ্ণসাগরে ড্রোন হামলায় জাহাজডুবি, ১১ নাবিক নিখোঁজ; বুলগেরিয়ায় বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ ইউরোপের কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে দুটি পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার পর একটি জাহাজ ডুবে গেছে এবং সেটির ১১ জন নাবিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। অন্য জাহাজটিও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে সেটিতে থাকা ১৫ জন নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বুলগেরিয়া নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। তবে হামলার জন্য কারা দায়ী, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডুবে যাওয়া জাহাজটির নাম এইচএস ডিগনিটি। এটি গিনি-বিসাউয়ের পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজ ছিল। জাহাজটি রোমানিয়ার ব্রাইলা বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। বুলগেরিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলের কাছে ক্রাপেতস গ্রামের আশপাশে হামলার পর জাহাজটি ডুবে যায়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজটির পাঁচজন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ১১ জনের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছিল বলে সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়।
একই সময়ে চেলসি থ্রি নামের আরেকটি পণ্যবাহী জাহাজেও ড্রোন হামলা হয়। জাহাজটি মাল্টার পতাকাবাহী এবং ইউক্রেনীয় পরিচালনায় চলছিল। বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ জানান, জাহাজটিতে তিনটি আকাশপথের ড্রোন আঘাত হানে। এতে জাহাজের ডেক ও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজটিতে থাকা ১৫ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাতজন ইউক্রেনের এবং আটজন আজারবাইজানের নাগরিক ছিলেন। পাঁচজন সামান্য আঘাতের কারণে চিকিৎসা নেন। কারও গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
বুলগেরিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ৩২ থেকে ৩৪ কিলোমিটার দূরে দুটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার সুনির্দিষ্ট উৎস ও পরিচালনাকারীদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত না হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত এবং তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ফলে শুধু নাবিকদের জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়ে না, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ হামলার নিন্দা জানিয়ে ঘটনাটিকে অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার পরিণতি রাশিয়ার স্বার্থের অনুকূলে যেতে পারে। তবে তিনি রাশিয়াকে সরাসরি হামলাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করেননি। বুলগেরিয়া রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ঘটনার বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। রুশ রাষ্ট্রদূত বলেছেন, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে এ বিষয়ে তাঁর কাছে তথ্য নেই। তিনি তৃতীয় কোনো পক্ষের উসকানির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। এসব বক্তব্যের কোনোটিই এখন পর্যন্ত হামলার দায় নিশ্চিত করে না।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছেন। তাঁর বক্তব্যে কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক নৌপরিবহন ও বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কর্মকর্তারাও বেসামরিক জাহাজে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, জোটটি কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি সমন্বয় করবে। তবে এসব প্রতিক্রিয়া হামলার দায় কার, সে প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয় না।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে কৃষ্ণসাগরীয় নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ চলছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশই আন্তর্জাতিক বাজারে শস্যসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে খাদ্যপণ্য পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা এবং পণ্যবাহী জাহাজের বিমা ও পরিচালন ব্যয়ে প্রভাব পড়তে পারে। তবে এই নির্দিষ্ট হামলার কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম কতটা বাড়বে, তা এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এর মাত্র এক সপ্তাহ আগেও বুলগেরিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে ড্রোন হামলার পর একটি জাহাজ ডুবে যাওয়া এবং নাবিক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। নতুন ঘটনাটি সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নজরদারি জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে জানানো হয়েছে।
কৃষ্ণসাগরে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং একটি জাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ। নিখোঁজ ১১ নাবিকের সন্ধান, হামলার উৎস শনাক্ত করা এবং বেসামরিক জাহাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন প্রধান বিষয়। তদন্তে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত হামলার জন্য কোনো দেশকে নিশ্চিতভাবে দায়ী করা উচিত নয়।





