যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম কমল, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জ্বালানি বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সরবরাহ ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি মূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ কমেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ ও জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
রয়টার্সের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১.১৮ ডলার বা প্রায় ১.১ শতাংশ কমে ১০৫.৪৭ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দাম ১.১৭ ডলার বা ১.৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯২.৫৭ ডলারে দাঁড়ায়। আগের দিন দুই ধরনের তেলের দামই প্রায় দুই ডলার বেড়েছিল। ফলে মঙ্গলবারের দরপতন বাজারে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়েছে, এমনটা বলার সুযোগ নেই।
তেলের দাম কমার অন্যতম কারণ হিসেবে রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনাকে বিবেচনা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, রাশিয়া বৈশ্বিক বাজারে ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছে। একই সময়ে তাঁর প্রশাসন রুশ জ্বালানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। নতুন সরবরাহ বাজারে এলে জ্বালানির ঘাটতি কিছুটা কমতে পারে এবং দামের ওপর চাপ হ্রাস পেতে পারে।
তবে এই সম্ভাব্য স্বস্তির বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে হুথি হামলার খবর এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর কোনো একটিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে আবারও তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাবনা থাকলেও ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার খবর পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি খাতে বিরতির সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একাংশ রুশ জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের উদ্বেগ, এ ধরনের পদক্ষেপ রাশিয়ার আয় বাড়াতে পারে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে ওয়াশিংটনের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তেলের বাজারের এই অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও প্রভাব ফেলতে পারে। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পেট্রল ও ডিজেলের উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ট্রাক, জাহাজ ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার খরচও বেড়ে যায়। এর ফলে খাদ্যপণ্য, পোশাক এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে পারে। অর্থাৎ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পেট্রল পাম্পেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পণ্য ও পরিষেবার দাম কমানো কঠিন হতে পারে। এতে সুদের হারসংক্রান্ত ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তেলের দাম কমলেই মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। শ্রমবাজার, আবাসন ব্যয়, ভোক্তাদের চাহিদা এবং অন্যান্য পণ্যের দামও মূল্যস্ফীতির গতিপথ নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, পরিবহন খরচ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্যমূল্যের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনের দরপতনের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জ্বালানি মূল্য বা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন হবে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে দাম কমলেও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এখনো গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। রাশিয়া থেকে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। আগামী দিনগুলোতে তেলের দাম কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতি, সংঘাতের বিস্তার এবং প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর পদক্ষেপের ওপর।





