যুদ্ধবিরতির এক বছরেও গাজায় পুনর্গঠন শুরু হয়নি, ধ্বংসস্তূপে দুর্বিষহ জীবন কাটছে লাখো মানুষের
যুদ্ধবিরতির এক বছর পেরিয়েও গাজায় ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ থমকে আছে; তাঁবু, ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, খাদ্যসংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে লাখো মানুষের।
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির এক বছর পূর্ণ হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষা শেষ হয়নি ফিলিস্তিনিদের। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি বড় আকারের সামরিক সংঘর্ষ কিছুটা কমালেও স্থায়ী শান্তি, নিরাপদ আশ্রয় এবং ব্যাপক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপত্যকাটির বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। কেউ তাঁবুতে, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে, আবার কেউ বসবাসের অনুপযোগী ঘরের ধ্বংসাবশেষের পাশে দিন কাটাচ্ছেন।
জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় প্রাণহানি ঘটেছে, মানবিক সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত রয়েছে এবং পুনর্গঠনের কাজ প্রত্যাশিত মাত্রায় শুরু করা যায়নি। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য শান্তির অর্থ এখনো নিরাপদ জীবন ফিরে পাওয়া নয়।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী দপ্তরের ২ অক্টোবর প্রকাশিত পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার বহু মানুষ এখনো অনিরাপদ আশ্রয়ে বসবাস করছেন। বর্ষা ও শীতের মৌসুম সামনে আসায় বন্যাপ্রবণ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, ক্ষতিগ্রস্ত ভবন এবং অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২ লাখ ৭৯ হাজার মানুষ এমন ৪০০টি বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থলে রয়েছেন, যেগুলো বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া দুই হাজার ৩০০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে মানুষ বসবাস করছেন, যেগুলো ভেঙে ফেলা প্রয়োজন বলে চিহ্নিত হয়েছে।
গাজার পুনর্গঠন কেন এত কঠিন হয়ে উঠেছে, তা বোঝা যায় জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ মূল্যায়ন থেকে। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত চূড়ান্ত মূল্যায়নে বলা হয়, আগামী দশকে গাজার পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রায় ৭ হাজার ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে প্রথম ১৮ মাসেই জরুরি পরিষেবা পুনরুদ্ধার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মেরামত এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করতে প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার ৬৩০ কোটি ডলার।
মূল্যায়নটিতে বলা হয়েছে, গাজায় ৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৮৮টির বেশি আবাসিক ইউনিট ধ্বংস হয়েছে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং কৃষি খাতও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অর্থাৎ শুধু বাড়িঘর নির্মাণ করলেই মানুষের জীবন স্বাভাবিক হবে না; একই সঙ্গে হাসপাতাল, বিদ্যালয়, বিদ্যুৎ, পানির সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, সড়ক এবং জীবিকা নির্বাহের সুযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে।
কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রী, ভারী যন্ত্রপাতি, জ্বালানি এবং নিরাপদে কাজ করার পরিবেশও জরুরি। সীমান্ত দিয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রবেশে বিধিনিষেধ, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক মতবিরোধ পুনর্গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ইসরায়েল নিরাপত্তার যুক্তিতে কিছু পণ্যের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে, মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও নির্মাণসামগ্রী ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
গাজায় বসবাসের সংকট শুধু ঘরবাড়ি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক পরিবার যুদ্ধের সময় নিরাপত্তার জন্য ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর কেউ কেউ ফিরে এসে দেখেছেন, তাঁদের বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা ভবনটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে সেখানে বসবাস করা বিপজ্জনক।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর গাজা নগরীর তাল আল-হাওয়া এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত ছয়তলা একটি ভবন ধসে অন্তত ২১ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে ১২ জন শিশু ছিলেন বলে স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা জানান। এ ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক ভবনও ভেতরে ভেতরে মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিরাপদ বিকল্প আশ্রয় না থাকায় কিছু পরিবার বাধ্য হয়ে এসব ভবনে ফিরে যাচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিশু, নারী, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছেন। বৃষ্টির পানি, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, শৌচাগারের অভাব এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। অস্থায়ী তাঁবুতে পর্যাপ্ত গোপনীয়তা, উষ্ণতা কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শীত ও বৃষ্টির সময় এই সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল গাজার মানুষের জন্য খাদ্যসংকটও বড় উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী দপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থের ঘাটতির কারণে অক্টোবর থেকে রান্না করা খাবার বিতরণ এবং পরিবারভিত্তিক খাদ্যসামগ্রীর সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। ফলে আগে থেকেই সংকটে থাকা পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জুলাইয়ে প্রকাশিত খাদ্যনিরাপত্তা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে গাজার ১৪ লাখের বেশি মানুষ সংকটজনক অথবা তার চেয়েও খারাপ মাত্রার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন। এটি ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির মূল্যায়ন; একে নির্দিষ্ট দিনে সবার খাদ্যসংকটের সরাসরি পরিমাপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে খাদ্য উৎপাদন, কৃষিজমি, মাছ ধরার সুযোগ এবং নিয়মিত সহায়তা ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বহু হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসক, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জ্বালানির ঘাটতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আহত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন হলেও সব জায়গায় সেই সুযোগ নেই। নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশনের অভাবে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
যুদ্ধবিরতির এক বছর পূর্তিতে শতাধিক মানবিক ও মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় প্রাণঘাতী হামলা এবং সহায়তা প্রবেশের বাধা অব্যাহত রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব উদ্ধৃত করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহের সময় ও হালনাগাদের কারণে কিছুটা আলাদা হতে পারে।
জাতিসংঘের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। গাজায় নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নে মতবিরোধ রয়ে গেছে। এসব বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
অন্যদিকে, ইসরায়েল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে এবং হামাসের ভূমিকা নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে বিরোধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জটিলতাও পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর, যাঁদের কাছে রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে নিরাপদ ঘর, খাবার, পানি ও চিকিৎসা বেশি জরুরি।
গাজায় স্থায়ী পুনরুদ্ধারের জন্য প্রথমেই বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ সরানো, নিখোঁজ মানুষের সন্ধান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা এবং বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা সচল করার কাজও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।
পুনর্গঠনের অর্থায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছ তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান অপরিহার্য। শুধু অস্থায়ী তাঁবু বিতরণ করে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মানুষকে নিজের বাড়িতে ফেরার সুযোগ দিতে হলে নিরাপদ আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবিকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
যুদ্ধবিরতির এক বছর পর গাজার বাস্তবতা তাই এক কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে গুলি ও বোমার শব্দ কিছুটা কমলেও মানুষের জীবন কখন স্বাভাবিক হবে? আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন বলছে, প্রয়োজনীয় সহায়তা, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া পুনর্গঠন দীর্ঘদিন থমকে থাকতে পারে। আর সেই বিলম্বের মূল্য দিতে হচ্ছে গাজার সাধারণ মানুষকে, যাঁরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও নিরাপদ জীবনে ফেরার অপেক্ষা করছেন।




