সোমবার দিল্লির রাজপথে বড় বিক্ষোভের ডাক ইন্ডিয়া জোটের, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে সোমবার দিল্লিতে বড় বিক্ষোভের ঘোষণা বিরোধীদের, প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপও চাইবে জোটটি।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সোমবার বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়া। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি এবং দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। একই দিনে জোটের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে বিষয়টিতে বিচার বিভাগীয় হস্তক্ষেপ চাইবে। শনিবার কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। খবরটি ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, সোমবার কংগ্রেসসহ ইন্ডিয়া জোটের নেতাকর্মীরা আবারও ব্যাপক সংখ্যায় রাস্তায় নামবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে বিরোধীদের এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালও বিরোধী দলগুলোর এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন নাগরিকদের এই প্রতিবাদে যোগ দেওয়া উচিত। বিরোধী জোটের দাবি, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
এই কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া। ভারতের নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ, অযোগ্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং যোগ্য ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সংশোধনের নামে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোর সমর্থক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিরোধী নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। তাঁরা কমিশনের নেতৃত্বে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ এবং কোনো রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার দাবি এখনো বিরোধীদের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। এসব অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের অবস্থান হলো, ভোটার তালিকা সংশোধন নির্ধারিত আইন ও বিধি মেনেই পরিচালিত হয়। যোগ্য ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি এবং অযোগ্য বা একাধিকবার নিবন্ধিত ভোটারের তথ্য যাচাই করা এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য। কমিশনের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচনী অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে বলা যায় না। এই কারণে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা দুই পক্ষের বক্তব্যই বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সোমবারের কর্মসূচির আগে বিরোধী জোটের নেতারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গেও দেখা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ ও দাবিগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ওই বৈঠকের পর রাহুল গান্ধী জানান, বিরোধীরা ভোটার অধিকার নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ অব্যাহতভাবে তুলে ধরবেন। বিরোধী নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির কাছে বিষয়টি উত্থাপনের পর এবার প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর আগে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে মিছিল করার চেষ্টা ঘিরে বিরোধী নেতাদের সঙ্গে পুলিশের টানাপোড়েন দেখা যায়। গত কয়েক দিনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী দলের কয়েকজন নেতাকে পুলিশ আটক করেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অনুমতি ছাড়া জমায়েত ঠেকানোর যুক্তি সামনে রেখেছে প্রশাসন।
দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কারণে যান চলাচল ও জনজীবনেও প্রভাব পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমবারের কর্মসূচিতে কত মানুষ অংশ নেবেন, কোন পথে মিছিল হবে এবং প্রশাসন কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেবে, সে বিষয়ে সব তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়। তাই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যানজট বা পুলিশের পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করার আগে প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিরোধী জোটের এই আন্দোলন এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিরোধীদের বক্তব্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ হতে হবে এবং যাঁরা বৈধ ভোটার, তাঁদের নাম কোনোভাবেই বাদ দেওয়া চলবে না। অন্যদিকে, সংশোধন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ও বৈধতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যাও জনসমক্ষে থাকা দরকার।
সোমবারের বিক্ষোভ এবং প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বিরোধী জোট তাদের দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইছে। তবে এই আন্দোলনের পর নির্বাচন কমিশন, সরকার কিংবা আদালত কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক নথি, ভোটার তালিকার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের অধিকার রক্ষা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখাই এই বিতর্কের প্রধান প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।




