ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র, সৌদি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে বাড়ছে আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা

ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা।

ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র, সৌদি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে বাড়ছে আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা
ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র, সৌদি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে বাড়ছে আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। সৌদি আরবের সমর্থনে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারপন্থী বাহিনী কৌশলগত লোহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের এলাকা পুনর্দখলে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। এর জবাবে হুতি যোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে। সংঘাতের বিস্তার সৌদি আরবের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অভিযান চালিয়ে ধুবাব এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে এবং মোখা শহরের দিকে অগ্রসর হয়। ইয়েমেনের সরকারি সূত্রগুলো ওই অভিযানে অগ্রগতির দাবি করলেও কয়েকটি এলাকায় লড়াই অব্যাহত থাকার খবরও পাওয়া যায়। ফলে পুরো অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতভাবে কার হাতে রয়েছে, তা নির্ধারণে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ইয়েমেনের সংঘাত দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে হুতি আন্দোলনের যোদ্ধারা রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটির গৃহযুদ্ধ আরও জটিল হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। দীর্ঘ সংঘর্ষে দেশটির অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি বড় ধরনের সংঘর্ষ অনেকটা কমিয়ে এনেছিল। কিন্তু চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে লড়াই বাড়তে শুরু করে। অক্টোবরের শুরুতে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল পুনর্দখলের অভিযান শুরু করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলা সেই সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

হুতি আন্দোলন ইরানের সমর্থনপুষ্ট বলে পরিচিত। সংগঠনটি ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে। দুই পক্ষের এই সংঘাত এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার বড় কারণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে চলাচলকারী বহু বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে। এখানে সংঘাত বাড়লে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রয়টার্সের ৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর ইয়েমেনে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনও বাড়ছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক পরিবার মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেও হিমশিম খাচ্ছে।

জাতিসংঘ ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের কারণে সড়ক ও সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক মানুষ এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো সংঘাতের প্রভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। লড়াই দীর্ঘায়িত হলে খাদ্যসংকট ও অপুষ্টির পরিস্থিতিও আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ অক্টোবরের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হওয়ার খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এ হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে। তবে হুতিরা ওই নির্দিষ্ট হামলার দায় স্বীকার করেছে কি না, সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে পার্থক্য রয়েছে। তাই দায় স্বীকারের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের পক্ষে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করার কথা বলেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি নতুন সামরিক অভিযানে যোগ দিয়েছে এমন সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংঘাতের পরবর্তী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইয়েমেনের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে লোহিত সাগরের নৌপথ, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়তে পারে। তবে সামরিক অভিযানের ফলাফল এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ইয়েমেনের বিভিন্ন সরকারবিরোধী ও সরকারপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্যও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখা। সামরিক অভিযানে কোনো পক্ষ সাময়িক সাফল্য পেলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।

ট্যাগ: ইয়েমেনইয়েমেনযুদ্ধহুতি_বিদ্রোহী

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…