উপসাগরে জাহাজে হামলা বাড়ছে, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার শঙ্কায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ
উপসাগরীয় জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ায় তেল সরবরাহ, জাহাজ চলাচল, পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জ্বালানি রপ্তানির বিকল্প পথ ব্যবহার করে কিছু সরবরাহ বজায় রাখা গেলেও সেই ব্যবস্থা সীমাহীন নয়। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেলবাহী পাইপলাইন দিয়ে লোহিত সাগরের দিকে তেল পাঠানো সম্ভব। উপসাগরের বাইরে অবস্থিত কিছু বন্দরও বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু পাইপলাইনের ধারণক্ষমতা, বন্দরের কার্যক্রম, জাহাজের প্রাপ্যতা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক পরিবহনব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়।
রয়টার্সের ৫ অক্টোবর প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি কিছু দিন যুদ্ধের আগের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ওই মাসে অঞ্চলটির অপরিশোধিত তেল ও ঘনীভূত জ্বালানি রপ্তানির দৈনিক গড় ছিল প্রায় এক কোটি ৮৩ লাখ ব্যারেল। সৌদি আরবের বাড়তি চালান এবং বিকল্প রপ্তানিপথ ব্যবহারের কারণে এই প্রবাহ বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে জাহাজে হামলা বাড়তে থাকায় এই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানি বাড়ার তথ্য থাকলেও সেটিকে নিরাপত্তাঝুঁকি দূর হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।
জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়লে প্রথমেই প্রভাব পড়ে বিমা ও পরিবহন ব্যয়ে। সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজের জন্য বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ঝুঁকিমূল্য ধার্য করতে পারে। কোনো কোনো জাহাজমালিক ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে চলতে পারেন, আবার কেউ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যাত্রা পিছিয়ে দিতে পারেন। এতে জাহাজের অপেক্ষার সময় বাড়ে, পরিবহনের সক্ষমতা কমে এবং আমদানিকারকদের জন্য পণ্য সংগ্রহের খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চললে তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্য পরিবহনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে সরবরাহে ঘাটতির স্থায়িত্ব, মজুতের পরিমাণ, বিকল্প রপ্তানিপথের সক্ষমতা এবং প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর। সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ে। তবে জাহাজে হামলার খবর প্রকাশিত হলেই তেলের দাম নির্দিষ্ট পরিমাণ বাড়বে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বাজারের প্রকৃত পরিবর্তন নির্ধারণ করতে হালনাগাদ লেনদেন ও সরবরাহের তথ্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্যও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজভাড়া ও বিমার খরচ বাড়লে জ্বালানি সংগ্রহের মোট ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় এবং পরিবহন খাতের ওপর পড়তে পারে। তবে বাংলাদেশের জ্বালানির দাম বা সরবরাহে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, মজুত, আমদানির উৎস এবং সরকারি মূল্যনীতির ওপর।
বিশ্লেষকদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা কত দিন স্থায়ী হবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল কত দ্রুত নিশ্চিত করা যাবে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলোর সতর্কতা, জাহাজের চলাচলসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথকে সামরিক সংঘাতের প্রভাব থেকে রক্ষা করা জরুরি।
উপসাগরীয় জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর সেই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে বিকল্প পথে কিছু রপ্তানি বজায় থাকায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এমন দাবি সঠিক নয়। সংকট দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ভর করছে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সক্ষমতার ওপর।





