৭ নভেম্বর: যেভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত অধ্যায়। বিএনপির কাছে দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’, যা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তি, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এবং পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। একদিকে জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ইতিহাস, অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের বেদনাদায়ক অধ্যায়—কেন ৭ নভেম্বর আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ? জানুন CSB NEWS USA-এর বিশেষ প্রতিবেদনে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশে ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক ঘটনা। সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের বিদ্রোহ, রাজনৈতিক কর্মীদের সক্রিয়তা এবং জনতার অংশগ্রহণে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর প্রত্যাবর্তন পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
বিএনপি দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। দলটির ঐতিহাসিক মূল্যায়নে, ৭ নভেম্বর ছিল জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সামরিক বাহিনীর ঐক্য এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তনের সূচনাবিন্দু। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালু, নির্বাচনী রাজনীতির বিকাশ এবং ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক ধারার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তৈরি হয়।
তবে ইতিহাসের এই দিনটি নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যও গভীর। আওয়ামী লীগ ও তাদের সমমনা রাজনৈতিক পক্ষ দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে অভিহিত করে। অন্যদিকে জাসদের একটি অংশ দিনটিকে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে মূল্যায়ন করে। বিশেষ করে ৭ নভেম্বরের সহিংসতা, মুক্তিযুদ্ধের কয়েকজন বীর সেনা কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে কর্নেল আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড ইতিহাসের এমন কিছু অধ্যায়, যেগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন আজও রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আলোচনার বিষয়।
কিন্তু ৭ নভেম্বরের প্রকৃত তাৎপর্য কোথায়? কেন এই দিনটি বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ভিত্তি? কীভাবে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলব্যবস্থা ও নির্বাচনী রাজনীতি নতুন রূপ পায়? আর জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এই দিনের ঐতিহাসিক বার্তা কী?
১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর: রাষ্ট্রীয় সংকটের ধারাবাহিকতা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় একের পর এক সংঘাত।
৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর বাসভবনে বন্দি করা হয়। খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
এই অস্থিরতার মধ্যেই ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এই হত্যাকাণ্ড এবং ধারাবাহিক ক্ষমতার পালাবদল রাষ্ট্রের সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক নথিতে ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে একাধিক সরকার, ব্যাপক প্রাণহানি এবং সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় পূর্ণ একটি অস্থির সময় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নথিটিতে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে জিয়াউর রহমানের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫: কেন এই দিনকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলা হয়?
৬ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। জাসদ-সংশ্লিষ্ট বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা এই বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগের সঙ্গে সাধারণ সৈনিকদের অংশগ্রহণ যুক্ত হয়।
এই অভ্যুত্থানের অন্যতম তাৎক্ষণিক ঘটনা ছিল বন্দি অবস্থায় থাকা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা। সৈনিকদের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ৩ নভেম্বরের ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং জিয়াউর রহমান পুনরায় সামরিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন।
বিএনপির ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায়, এই ঘটনা ছিল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে সিপাহী-জনতার সম্মিলিত অবস্থান। তাদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক বাহিনীর বিভক্তি এবং জাতীয় নেতৃত্বের সংকটের মধ্যে ৭ নভেম্বর একটি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার পথ তৈরি করেছিল।
এই মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো, জিয়াউর রহমান তখন শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না; মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা এবং স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে তাঁর একটি পরিচিত জাতীয় অবস্থানও তৈরি হয়েছিল। ১৯৭১ সালে তিনি সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
তবে ঐতিহাসিকভাবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন: ৭ নভেম্বরের পরপরই বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেদিন সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয় এবং জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পথ তৈরি হয়। পরবর্তী কয়েক বছরে তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস ঘটে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান: মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন অবদান এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব—দুটি অধ্যায়ই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। পরবর্তী সময়ে প্রথম সেক্টরের অধিনায়ক এবং জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বীর উত্তম খেতাব লাভ করেন।
স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এবং পরে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে বন্দি হওয়ার পর ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
৭ নভেম্বর বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে রেখে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কাঠামো গঠিত হয়। জিয়াউর রহমানসহ তিন বাহিনীর প্রধানদের উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ৭ নভেম্বরের ঘটনাই তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের তাৎক্ষণিক ভিত্তি তৈরি করলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার নতুন রূপ নির্ধারণ করে।
বহুদলীয় রাজনীতির প্রত্যাবর্তন: জিয়াউর রহমানের শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু এবং বাকশালভিত্তিক একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীন কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ে।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দলবিধি বা Political Parties Regulation জারি করা হয়। এর আওতায় নির্দিষ্ট সরকারি অনুমোদন ও শর্তসাপেক্ষে রাজনৈতিক দলগুলো সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পায়।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক কার্যক্রমের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই প্রক্রিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক:
- ১৯৭৬: রাজনৈতিক দলবিধির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সীমিত কার্যক্রমের সুযোগ পুনরায় চালু।
- ১৯৭৭: জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা ও জনসম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব।
- ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮: জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠনের উদ্যোগ।
- জুন ১৯৭৮: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জিয়াউর রহমান ছয় দলীয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।
- ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান।
- ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯: জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন লাভ করে।
- ৯ এপ্রিল ১৯৭৯: পঞ্চম সংশোধনী পাসের পর সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়।
এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও একদলীয় কাঠামোর পর একাধিক রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন ছিল সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি।
অর্থাৎ, বহুদলীয় রাজনীতির প্রত্যাবর্তন কোনো এক দিনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যার নেতৃত্বে ছিলেন জিয়াউর রহমান।
বিএনপির জন্ম ও ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সম্পর্ক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পর তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তি, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, পেশাজীবী, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার নেতাদের নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই উদ্যোগ একটি সাংগঠনিক রূপ পায়।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই ধারণায় ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পার্থক্য অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অধীনে বসবাসকারী সব নাগরিককে একটি জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাপিডিয়ার ঐতিহাসিক বিবরণেও জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধারণার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের মানুষের মধ্যে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এই ধারণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
বিএনপির কাছে ৭ নভেম্বর তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয়; এটি দলটির প্রতিষ্ঠাতার রাজনৈতিক উত্থান, জাতীয়তাবাদী দর্শনের বিকাশ এবং দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভিত্তি।
১৯ দফা কর্মসূচি: জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়ন ভাবনার রাজনৈতিক ভিত্তি
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ ছিল ১৯ দফা কর্মসূচি। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল ঘোষিত এই কর্মসূচিতে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, কৃষি উন্নয়ন, শিক্ষা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি খাতের বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কর্মসূচির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল:
১. জাতীয় স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা।
২. জনগণের অংশগ্রহণে প্রশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা।
৩. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন।
৪. শিক্ষা বিস্তার ও নিরক্ষরতা দূরীকরণ।
৫. নারী, যুবক ও শ্রমজীবী মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন।
৬. বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ।
৭. প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা।
৮. ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক অধিকার এবং জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা।
এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।
তাঁর শাসনামলে কৃষি, রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও গ্রামীণ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। খাল খনন, গণশিক্ষা এবং পরিবার পরিকল্পনার মতো কর্মসূচিও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ভাবনার অংশ হয়ে ওঠে।
তবে এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক ফলাফল এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়নে বিভিন্ন মত রয়েছে। ফলে ১৯ দফার গুরুত্ব নির্ধারণে ঘোষিত লক্ষ্য এবং বাস্তব অর্জন—দুটিই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
জাতীয় ঐক্য ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক বার্তা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতীয় পরিচয়, রাষ্ট্রীয় আদর্শ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে বিভিন্ন মতাদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা সামনে আনেন।
এই ধারণার মূল বক্তব্য ছিল—বাংলাদেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয় শুধু ভাষা বা সংস্কৃতির একক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের ভূখণ্ড, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সম্মিলিত রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে এই জাতীয়তাবাদ পরবর্তী সময়ে একটি কেন্দ্রীয় অবস্থান লাভ করে।
জাতীয় ঐক্যের এই ধারণার রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল কয়েকটি ক্ষেত্রে:
- ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের ধারণা তৈরি।
- ধর্মীয় ও জাতিগত বৈচিত্র্যকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা।
- জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
- রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নির্বাচনী প্রতিযোগিতার পরিসর সম্প্রসারণ।
তবে জাতীয় ঐক্য কেবল একটি রাজনৈতিক দলের দর্শন বা নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী মতের অধিকার, সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাও জাতীয় সংহতির অপরিহার্য শর্ত।
কেন বিরোধীরা ৭ নভেম্বরকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ বলে?
৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কগুলোর একটি হলো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড।
এই দিন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার নিহত হন। তাঁরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং সামরিক বাহিনীতে সম্মানিত কর্মকর্তা ছিলেন।
আওয়ামী লীগ ও তাদের সমমনা রাজনৈতিক পক্ষ এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে অভিহিত করে। তাদের বক্তব্য, ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহ সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া একাধিক কর্মকর্তার প্রাণহানির পথ তৈরি করে।
এই অবস্থানের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা রয়েছে—৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সামরিক বাহিনীর ভেতরে সহিংসতা ও প্রাণহানি ঘটেছিল। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা—বিএসএসের ২০২৩ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই তিন কর্মকর্তাকে কারা কী পরিস্থিতিতে হত্যা করেছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও মতপার্থক্য রয়েছে। প্রতিবেদনে তৎকালীন একজন সেনা কর্মকর্তার প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণও তুলে ধরা হয়।
অন্যদিকে বিএনপির অবস্থান হলো, ৭ নভেম্বরের মূল ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে শুধু পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যথাযথ নয়। দলটির মতে, সাধারণ সৈনিক ও জনতার অংশগ্রহণে সেদিন যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এখানে উল্লেখযোগ্য, ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা এবং ৭ নভেম্বরের সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড দুটি পৃথক ঘটনা। জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে; আর খালেদ মোশাররফ, নাজমুল হুদা ও এ টি এম হায়দার নিহত হন ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে। ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়নে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কর্নেল আবু তাহের: ৭ নভেম্বরের আরেকটি অমীমাংসিত অধ্যায়
৭ নভেম্বরের ইতিহাসে কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনা কর্মকর্তা এবং জাসদের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে আলোচিত। জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার ঘটনাতেও এই উদ্যোগের সরাসরি সম্পর্ক ছিল।
তবে ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাহেরের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক বিচারের পর ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এই ঘটনা ৭ নভেম্বরের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে—যে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়েছিলেন, সেই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক আবু তাহের পরবর্তী সময়ে কেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লেন?
এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে ৭ নভেম্বরকে শুধু বিএনপি বা জাসদের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তৎকালীন সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ইতিহাস বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
৭ নভেম্বর ও বাংলাদেশের গণতন্ত্র: ঐতিহাসিক অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বহুদলীয় রাজনীতির পরিসর পুনরায় চালুর উদ্যোগ। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি ছাড়াও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপির ২০৭টি আসন লাভের মধ্য দিয়ে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় নির্বাচনী ভিত্তি অর্জন করে।
এই ঘটনাগুলোকে বহুদলীয় রাজনীতির প্রত্যাবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়।
তবে ইতিহাসের আরেকটি দিকও বিবেচনায় রাখতে হয়। ১৯৭৫ সালের পর থেকে ১৯৭৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশ সামরিক আইন ও সামরিক প্রভাবাধীন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালুর সুযোগ এলেও তা প্রথমদিকে সরকারি অনুমোদন ও বিধিনিষেধের অধীন ছিল।
এ ছাড়া ১৯৭৭ সালের গণভোটের ফলাফল, ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে গবেষক ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে বিভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।
সুতরাং জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক অবদান মূল্যায়নে দুটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি: একদিকে বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন; অন্যদিকে সামরিক আইন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা।
এমন ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়নই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করে।
বিএনপির রাজনীতিতে ৭ নভেম্বর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে ৭ নভেম্বরের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে দলটির রাজনৈতিক পরিচয়, ইতিহাস ও সাংগঠনিক চেতনায় দিনটির বিশেষ স্থান রয়েছে।
বিএনপির কাছে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব কয়েকটি প্রধান কারণে:
প্রথমত, প্রতিষ্ঠাতার রাজনৈতিক উত্থান: এই দিন জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
দ্বিতীয়ত, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশ: তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি লাভ করে।
তৃতীয়ত, বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন: রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালু এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
চতুর্থত, বিএনপির প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন একটি সাংগঠনিক রূপ লাভ করে।
পঞ্চমত, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: বিএনপির রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
এই কারণে বিএনপির কাছে ৭ নভেম্বর কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি দলটির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, প্রতিষ্ঠাতার ভূমিকা এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশের জন্য ৭ নভেম্বরের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা আজকের বাংলাদেশের জন্যও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সংকটের সময় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা কতটা জরুরি, তা এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব ১৯৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট হয়।
তৃতীয়ত, একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিরোধী মতের স্বাধীনতা, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম অপরিহার্য।
চতুর্থত, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
পঞ্চমত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী সব পক্ষের অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কর্তব্য।
৭ নভেম্বরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই—রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্য রক্ষার জন্য শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি।
উপসংহার: ইতিহাসের স্বীকৃতি, জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি দিন, যার প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনীতি, সামরিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর পড়েছে। এই দিন জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পথ তৈরি করে এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে বহুদলীয় রাজনীতি ও নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচিত হয়।
বিএনপির জন্য এটি প্রতিষ্ঠাতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অন্যতম ঐতিহাসিক ভিত্তি। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের কাছে একই দিন সামরিক বিশৃঙ্খলা, মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিতর্কিত অধ্যায়ের প্রতীক।
ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হলে কোনো একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে প্রামাণ্য দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব—বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, জনগণের ভোটাধিকার, বহুদলীয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সামরিক বাহিনীর পেশাদারত্ব এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা যায় না।
৭ নভেম্বরের ইতিহাস তাই শুধু অতীতের ক্ষমতার পালাবদলের বিবরণ নয়; এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মারক।
CSB NEWS USA | Global News Desk | South Asia Focus






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।