যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারের অসুস্থ সদস্যের সেবায় বছরে ১১ হাজার ডলারের বেশি খরচ
যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের অসুস্থ ও বয়স্ক সদস্যের দেখাশোনায় বছরে গড়ে ১১ হাজার ৫০৮ ডলার খরচ করছেন স্বজনেরা, বাড়ছে আর্থিক চাপ।
যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের অসুস্থ, প্রতিবন্ধী কিংবা বয়স্ক সদস্যের দেখাশোনা করতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন অনেক মানুষ। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের সদস্য বা পরিচিত কারও যত্ন নেওয়ার জন্য একজন সেবাদানকারীকে বছরে গড়ে নিজের পকেট থেকে ১১ হাজার ৫০৮ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। পাঁচ বছর আগে এই খরচের পরিমাণ ছিল গড়ে ৭ হাজার ২৪২ ডলার। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে এই ব্যয় প্রায় ৫৯ শতাংশ বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ নাগরিকদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান এএআরপি ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। ২০২৬ সালের জুন ও জুলাই মাসে ২ হাজার ৫৩৮ জন পারিবারিক সেবাদানকারীর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যের যত্ন নেওয়ার জন্য ব্যয় করা অর্থ একজন সেবাদানকারীর পরিবারের বার্ষিক আয়ের গড়ে ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি অন্যের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে আয়ের বড় একটি অংশ খরচ করতে হচ্ছে।
এই খরচের মধ্যে রয়েছে খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার সামগ্রী কেনা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অসুস্থ সদস্যকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে গাড়ির জ্বালানি খরচ হয়। কারও বাড়িতে চলাচলের সুবিধা তৈরি করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়। আবার কেউ কেউ বাড়িতে পরিচর্যাকারী নিয়োগ করেন, যাতে কাজের সময় পরিবারের সদস্যের দেখাশোনা করা যায়। এসব ছোট-বড় খরচ মিলেই পরিবারের বাজেটে বড় চাপ তৈরি করছে।
পরিবারের যত্ন নেওয়ার খরচের সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে বাসস্থান ও গৃহস্থালির কাজে। এ খাতে বছরে গড়ে ৪ হাজার ৭৯৭ ডলার ব্যয় হচ্ছে। চিকিৎসা বাবদ বছরে গড়ে খরচ হচ্ছে আরও ৩ হাজার ৩১৩ ডলার। অর্থাৎ বাসস্থান, সংসারের প্রয়োজন এবং চিকিৎসা মিলিয়েই মোট ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। বিমার টাকা, চিকিৎসকের কাছে নিজের পকেট থেকে দেওয়া অর্থ এবং অন্যান্য চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যয়ও এই চাপ বাড়াচ্ছে।
কম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। যেসব পরিবারের বার্ষিক আয় ৪০ হাজার ডলারের কম, তারা পরিচর্যার পেছনে গড়ে ১১ হাজার ৪৪৮ ডলার খরচ করছে। এই ব্যয় তাদের পরিবারের বার্ষিক আয়ের গড়ে ৭৬ শতাংশের সমান। ফলে খাবার, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এবং নিজেদের চিকিৎসার মতো প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে তাদের বড় সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
যাঁরা স্মৃতিভ্রংশ বা আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির দেখাশোনা করেন, তাঁদের ব্যয় আরও বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের রোগীর পরিচর্যায় বছরে গড়ে ১৫ হাজার ৮৪৬ ডলার খরচ হচ্ছে। অন্যদিকে, যাঁরা এ ধরনের রোগে আক্রান্ত নন, তাঁদের দেখাশোনায় বছরে গড়ে ১০ হাজার ২২১ ডলার ব্যয় হচ্ছে। রোগীর যত্নের জন্য যত বেশি সময় ও চিকিৎসাসহায়তা প্রয়োজন হয়, পরিবারের খরচও সাধারণত তত বেড়ে যায়।
এই দায়িত্ব কর্মজীবী মানুষের চাকরিতেও প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া কর্মজীবী সেবাদানকারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্যের যত্ন নেওয়ার কারণে তাঁদের কাজের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে, ছুটি নিতে হয়েছে কিংবা অন্যভাবে কর্মজীবন সামলাতে হয়েছে। কেউ কেউ কাজের সময় কমিয়েছেন, আবার কেউ অতিরিক্ত কাজ নিয়েছেন। কিছু মানুষ পরিবারের সদস্যের পাশে থাকার জন্য আগেভাগে চাকরি ছেড়ে দিতেও বাধ্য হয়েছেন। এতে পরিচর্যার খরচ বাড়ার পাশাপাশি পরিবারের আয়ও কমে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ পরিবারের সদস্য বা পরিচিত কারও দেখাশোনায় নিয়মিত সাহায্য করছেন বলে এএআরপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা ওষুধ খাওয়ার বিষয়টি দেখেন, খাবার তৈরি করেন, চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান এবং দৈনন্দিন নানা কাজে সহায়তা করেন। তাঁদের অনেকেই বিনা বেতনে এই দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তাঁদের শ্রম পরিবারের সদস্যদের নিজ বাড়িতে থাকতে সাহায্য করলেও নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক সেবাদানকারী নিজেদের সঞ্চয় ব্যবহার করছেন, অবসরের জন্য জমানো অর্থ কমাচ্ছেন কিংবা ঋণ নিচ্ছেন। এতে ভবিষ্যতে তাঁদের নিজেদের চিকিৎসা ও অবসরকালীন জীবন চালানোর সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের সদস্যের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে।
এএআরপি পরিচর্যাকারীদের আর্থিক সহায়তার জন্য কর ছাড়, সাশ্রয়ী মূল্যে বাড়িতে পরিচর্যা, প্রয়োজনের সময় বিকল্প সেবার ব্যবস্থা এবং কর্মজীবীদের জন্য বেতনসহ ছুটির মতো পদক্ষেপের কথা বলেছে। তবে এসব সুবিধা সব অঙ্গরাজ্যে একইভাবে পাওয়া যায় না। কোন সহায়তা পাওয়া যাবে, তা স্থানীয় নিয়ম, আয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের বয়স্ক বাবা-মা, অসুস্থ স্বজন কিংবা প্রতিবন্ধী সদস্যের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকেই কাজ ও সংসারের খরচ একসঙ্গে সামলান। তাই পরিচর্যার জন্য সম্ভাব্য ব্যয় আগে থেকে হিসাব করা, স্থানীয় সহায়তা কর্মসূচির তথ্য নেওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে ছুটি বা অন্যান্য সুবিধা সম্পর্কে জানা উপকারী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের সদস্যের যত্ন নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়া অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণার তথ্য দেখাচ্ছে, এই দায়িত্ব পালনের জন্য মানুষ শুধু অর্থই ব্যয় করছেন না, বরং নিজের কাজ, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনছেন। পরিবারের সদস্যের পাশে দাঁড়ানো যেন নিজের আর্থিক নিরাপত্তা হারানোর কারণ না হয়, সে জন্য আরও সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।