যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তৃতীয় প্রান্তিকে ৩.২ শতাংশ বাড়তে পারে, আজ প্রকাশ হবে সরকারি হিসাব
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কতটা এগিয়েছে, তা জানতে আজ প্রকাশের অপেক্ষায় তৃতীয় প্রান্তিকের হিসাব। ভোক্তাদের ব্যয় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগে নজর অর্থনীতিবিদদের।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কতটা বেড়েছে, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে দেশটি। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বার্ষিক হিসাবে ৩ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এই পূর্বাভাস বাস্তব হলে আগের প্রান্তিকের তুলনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ার ইঙ্গিত মিলবে। তবে সরকারি হিসাব প্রকাশের আগে এই সংখ্যাকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অধীন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ব্যুরো তৃতীয় প্রান্তিকের প্রাথমিক জিডিপি হিসাব প্রকাশের সময় নির্ধারণ করেছিল ২৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে আটটায়, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় অনুযায়ী। রয়টার্সের অর্থনীতিবিদদের জরিপেও প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আগের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি বার্ষিক হিসাবে ২ দশমিক ২ শতাংশ হারে বেড়েছিল। ফলে নতুন পূর্বাভাস সঠিক হলে প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে সাধারণ মানুষের কেনাকাটা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ভোক্তাদের ব্যয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, যাতায়াত, বাসস্থান এবং অন্যান্য পণ্য ও সেবার জন্য মানুষের ব্যয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আয় ও উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। মানুষ বেশি পণ্য ও সেবা কিনলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বাড়াতে পারে। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসতে পারে।
তৃতীয় প্রান্তিকে ভোক্তাদের ব্যয় বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশের বেশি হতে পারে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে মানুষের ব্যয় বাড়লেই যে সবার আর্থিক অবস্থা ভালো হচ্ছে, তা বলা যায় না। অনেক পরিবারকে খাবার, জ্বালানি, বাসাভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আয় বাড়লেও যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম দ্রুত বাড়ে, তাহলে পরিবারের হাতে সঞ্চয়ের জন্য কম অর্থ থাকতে পারে।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো, কম্পিউটার সরঞ্জাম, তথ্যকেন্দ্র এবং নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এসব বিনিয়োগের কারণে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ টানা কয়েকটি প্রান্তিকে শক্তিশালী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদেরা ধারণা করছেন।
তবে এই বিনিয়োগের সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল অর্থ ব্যয় করলেই ভবিষ্যতে সমপরিমাণ আয় নিশ্চিত হবে না। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত মুনাফা করতে না পারলে নতুন বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তিসেবা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই এআই খাতে বিনিয়োগের কারণে অর্থনীতি বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানি বেড়ে যাওয়াও প্রবৃদ্ধির হিসাবে চাপ তৈরি করতে পারে। বিদেশ থেকে বেশি পণ্য আমদানি হলে জিডিপি হিসাবের নির্দিষ্ট অংশে তা বিয়োগ হিসেবে গণনা করা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই খাতের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মূলধনি পণ্যের চাহিদা বাড়ায় আমদানির পরিমাণও বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, বাণিজ্য ঘাটতি তৃতীয় প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, মজুত পণ্য এবং সরকারি ব্যয় সেই প্রভাবের কিছুটা অংশ সামাল দিতে পারে।
জ্বালানির দামও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেশি থাকলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়তে পারে। গাড়িতে জ্বালানি কেনা, পণ্য পরিবহন এবং উৎপাদন পরিচালনার খরচ বাড়লে অন্যান্য খাতে ব্যয় করার জন্য মানুষের হাতে কম অর্থ থাকতে পারে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর দাম ও ঋণের খরচ বেশি থাকলে বাড়ি নির্মাণ এবং আবাসন খাতের বিনিয়োগও বাধার মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হিসাব প্রকাশের সময় সাধারণ মানুষের আর্থিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে বাড়লেও সব আয়ের মানুষের কাছে সেই সুবিধা সমানভাবে পৌঁছায় না। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ রয়েছে এমন উচ্চ আয়ের পরিবার সম্পদের মূল্য বাড়ার সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে, কম ও মধ্যম আয়ের পরিবারকে খাবার, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং জ্বালানির খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হতে পারে। তাই শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার পুরো চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শক্তিশালী থাকলেও মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত জটিল হতে পারে। ঋণের সুদ বেশি থাকলে বাড়ি কেনা, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং বড় কেনাকাটার খরচ বাড়ে। ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় প্রান্তিকের জিডিপি হিসাব যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি বাড়লে তা ভোক্তাদের ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের শক্তিশালী অবস্থার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে প্রকৃত সরকারি হিসাব প্রকাশের পরই বোঝা যাবে অর্থনীতি প্রত্যাশিত গতিতে বেড়েছে কি না। পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কতটা চাপ তৈরি করছে এবং এআই খাতের বিনিয়োগ কতটা টেকসই হচ্ছে—এসব বিষয়ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।