তাহসিফ সাউরির মৃত্যু, হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ও ‘র’ বিতর্ক: প্রশ্নের মুখে আমার দেশ-এর প্রতিবেদন
গত ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন টানা দেড় দশক ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা শেখ হাসিনা। পুরো দেশ তখনো ধোঁয়াশায়, ঠিক তখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে— সামরিক বিমানে করে পালাচ্ছেন তিনি। মুহূর্তেই পতন নিশ্চিত হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। জাতির সেই ক্রান্তিলগ্নে যে মানুষটি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ঐতিহাসিক সত্যটি জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন, সেই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির নিথর দেহ উদ্ধার হলো তুরাগ নদী থেকে। তাকে চাকরিচ্যুত করা এবং এই করুণ মৃত্যুর পেছনে কি কেবলই একটি পত্রিকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ দায়ী? তাকে কেন 'র'-এর এজেন্ট বানানো হলো? পর্দার আড়ালের হিসাবনিকাশ নিয়ে উঠছে চাঞ্চল্যকর সব প্রশ্ন।
তুরাগ নদীতে বিষণ্ণ সমাপ্তি ও একটি অসমাপ্ত গল্প
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির মরদেহ সম্প্রতি তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা— সে বিষয়ে পুলিশ এখনো কোনো সুস্পষ্ট কারণ উদঘাটন করতে পারেনি। তবে এই মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে আছে ৫ আগস্টের এক ঐতিহাসিক ঘটনার করুণ পরিণতি এবং মিডিয়া ট্রায়ালের এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত।
'আমার দেশ' পত্রিকার ন্যারেটিভ এবং যৌক্তিক অসঙ্গতি
মৃত্যুর আগে তাহসিফ সাউরিকে নিয়ে দৈনিক 'আমার দেশ' পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে তাকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র' (RAW)-এর এজেন্ট হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। পত্রিকার দাবি অনুযায়ী, "শেখ হাসিনা সি-১৩০-জে বিমানে করে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে দিল্লি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার পলায়নের এই রুট যাতে জানাজানি না হয়ে যায়, সেজন্য ছবিটি তোলা ও ভাইরাল করা হয়, যাতে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে ত্রিপুরা পালিয়ে যাচ্ছেন— এই ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা পায়।"
বিশ্লেষক ও সাধারণ পাঠকদের মতে, এই বাক্যের গঠন এবং যুক্তি চরমভাবে সাংঘর্ষিক। পলায়নের বিষয় গোপন রাখার উদ্দেশ্য থাকলে কেউ কি নিজ আইডিতে প্রকাশ্যে সেই ছবি বা ভিডিও ভাইরাল করে? কোনো গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট কি কখনো এত বড় স্পর্শকাতর বিষয়ে নিজের পরিচয় উন্মুক্ত করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেয়? যদি শেখ হাসিনার পলায়ন গুজব হতো এবং তাহসিফ সেটি ছড়াতেন, তবে তাকে এজেন্ট ভাবার অবকাশ ছিল। কিন্তু তথ্যটি যখন শতভাগ সত্য, তখন তাকে কোন যুক্তিতে 'র'-এর এজেন্ট বলা হলো?
ভিডিওটি ফাঁস না হলে সেদিন কী হতো?
বাস্তবতার নিরিখে হিসাব করলে দেখা যায়, তাহসিফ সাউরির প্রকাশ করা ওই ভিডিওটি সেদিন বাংলাদেশকে এক বিশাল রক্তপাতের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। ভিডিওটি প্রকাশ না পেলে দুটি ঘটনা ঘটতে পারতো:
১. পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে আওয়ামী লীগ হয়তো দাবি করতো শেখ হাসিনা দেশেই আছেন এবং পুনরায় ক্ষমতা দখলের একটি নীল নকশা তৈরি হতো।
২. সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হতো— উত্তেজিত জনতা শেখ হাসিনাকে খুঁজতে ক্যান্টনমেন্টসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্পর্শকাতর সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় ঢুকে পড়তো। জনরোষের আগুনে সেদিন গুঁড়িয়ে যেতো অনেক কিছু।
ওই উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে শেখ হাসিনার পলায়নের চাক্ষুষ প্রমাণের বিকল্প ছিল না। সেই অসামান্য কাজটিই করেছিলেন তাহসিফ।
রাশেদের যৌক্তিক প্রশ্ন: হিরোকে কেন ভিলেন বানানো হলো?
গণঅভ্যুত্থান পরিষদের নেতা রাশেদ এ বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি অত্যন্ত যৌক্তিক একটি প্রশ্ন সামনে এনেছেন— "তাহসিফ সাউরি যদি 'র'-এর এজেন্টই হতেন, তবে তো তিনি শেখ হাসিনার পলায়নের ভিডিও প্রকাশই করতেন না! শেখ হাসিনার পলায়ন গোপন রাখলেই বরং তার এজেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে ।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।