মূল্যস্ফীতির চাপে মার্কিন পরিবার, সুদের সিদ্ধান্তের দিকে নজর
জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাড়তি খরচে চাপে মার্কিন পরিবার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সিদ্ধান্তে নজর রাখছেন অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ পরিবারের বাজেটে চাপ তৈরি করছে। একই সময়ে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বুঝতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ এবং ফেডের বৈঠক থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা-আস্থা জরিপ অনুযায়ী, অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা-আস্থা সূচক ৪৮ দশমিক শূন্যে নেমেছে। সেপ্টেম্বরে সূচকটি ছিল ৪৮ দশমিক ১। সামান্য এই পতন দেখায় যে অর্থনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এখনো কাটেনি। জরিপে মূল্যবৃদ্ধি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। অর্থাৎ মানুষের আয় থাকলেও বাড়তি খরচ মেটানোর পর আগের মতো কেনাকাটা করার সুযোগ কমে যাচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। পাশাপাশি বাসস্থান, পরিবহন ও অন্যান্য পরিষেবার খরচও পরিবারগুলোর ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে সব পণ্য ও পরিষেবার দাম একই হারে বাড়ছে না; কোন খাতে কতটা মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু গাড়িতে তেল ভরার খরচে সীমাবদ্ধ থাকে না। পণ্য পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার খরচও বেড়ে যেতে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সেই বাড়তি ব্যয়ের কিছু অংশ পণ্যের দাম বা পরিষেবার মাশুলের সঙ্গে যুক্ত করলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাকেই বেশি অর্থ দিতে হয়। ফলে পরিবারের খাদ্য, যাতায়াত, বাসাভাড়া ও অন্যান্য জরুরি খরচের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারের সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ালে সাধারণত ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যায়। এর প্রভাব বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ, ব্যবসায়িক ঋণ এবং কিছু ধরনের ক্রেডিট কার্ডের সুদে পড়তে পারে। এতে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমতে পারে, যা সময়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে উচ্চ সুদের হার দীর্ঘদিন বজায় থাকলে বাড়ি কেনা, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ করাও কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে সুদের হার কমানো হলে ঋণ নেওয়ার খরচ কমার সুযোগ তৈরি হয়। এতে ব্যবসা ও ভোক্তাদের ব্যয় বাড়তে পারে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে অতিরিক্ত চাহিদা আবার দাম বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণেই ফেডারেল রিজার্ভকে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়।
ফেডারেল রিজার্ভের ২৭ ও ২৮ অক্টোবরের বৈঠকে সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত আসার কথা। বাজারের অনেক পর্যবেক্ষক এবার সুদের হার অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা দেখছেন। তবে সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে আবার সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ফেড মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য তথ্য বিবেচনা করবে। তাই বৈঠকের আগে বাজারের প্রত্যাশাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
এই সপ্তাহে প্রকাশিতব্য আরও কিছু অর্থনৈতিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ফেডের পছন্দের মূল্যস্ফীতি সূচক ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ের মূল্যসূচক এবং আয়-ব্যয়ের তথ্য। এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি কতটা স্থায়ী হচ্ছে এবং পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর তার প্রভাব কতটা গভীর, সে সম্পর্কে আরও ধারণা পাওয়া যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর জন্য মূল প্রশ্ন হলো, আয় বাড়ার তুলনায় দৈনন্দিন খরচ কতটা বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ সব পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়; বরং দাম বাড়ার গতি কমে আসাও মূল্যস্ফীতি হ্রাসের লক্ষণ হতে পারে। তাই সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বস্তি ফিরতে সময় লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল ভোক্তা-আস্থা এবং সুদের হারের অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ের মধ্যে নিয়ে এসেছে। ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত এবং নতুন অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হচ্ছে কি না এবং আগামী মাসগুলোতে ঋণ ও দৈনন্দিন ব্যয়ের পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে। তবে পরিবারের ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে জ্বালানির দাম, আয়, কর্মসংস্থান এবং ঋণের খরচের পরবর্তী পরিবর্তনের ওপর।





মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।