নিজ দেশে তেল উৎপাদন করেও ক্যালিফোর্নিয়ায় হাওয়াইয়ের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে পেট্রল
৮,৬৫৪ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে গাড়িচালকদের পেট্রল কিনতে হাওয়াইয়ের বাসিন্দাদের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অথচ ক্যালিফোর্নিয়া নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম তেল উৎপাদনকারী অঙ্গরাজ্য। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ হাওয়াইয়ে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করা হয় না। তারপরও সেখানে পেট্রলের গড় দাম ক্যালিফোর্নিয়ার তুলনায় কম। এই পরিস্থিতি জ্বালানির দাম নির্ধারণে স্থানীয় তেল উৎপাদনের পাশাপাশি কর, শোধনাগার, পরিবহনব্যবস্থা, পরিবেশনীতি ও বাজারের সরবরাহ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সামনে এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িচালকদের সংগঠন আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ায় সাধারণ মানের এক গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ছিল প্রায় ৬ দশমিক ১৪ ডলার। একই দিনে হাওয়াইয়ে এর দাম ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৬৩ ডলার। অর্থাৎ প্রতি গ্যালনে ক্যালিফোর্নিয়ার চালকদের প্রায় ৫১ সেন্ট বেশি দিতে হয়েছে। পরিমাণটি সামান্য মনে হলেও নিয়মিত গাড়ি ব্যবহারকারীদের মাসিক ও বার্ষিক ব্যয়ে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
২১ অক্টোবর প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যেও ক্যালিফোর্নিয়ায় পেট্রলের গড় দাম ৬ ডলারের ওপরে ছিল। সেদিন অঙ্গরাজ্যটিতে সাধারণ মানের এক গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ছিল প্রায় ৬ দশমিক ১১ ডলার। এই হিসাব দেখায়, এক দিনের দাম সামান্য কমলেও সেখানে জ্বালানির উচ্চমূল্যের সমস্যা এখনো রয়েছে। তবে পেট্রলের দাম প্রতিদিন পরিবর্তিত হয়। তাই নির্দিষ্ট দিনের গড় দামকে সব শহর, সব জ্বালানি স্টেশন কিংবা সব ধরনের পেট্রলের জন্য একই বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
ক্যালিফোর্নিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অঙ্গরাজ্যটিতে তেল উৎপাদন করা হলেও সেই তেল থেকে তৈরি পেট্রল সহজে এবং কম খরচে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায় না। অপরিশোধিত তেল উত্তোলন এবং গাড়িতে ব্যবহারের উপযোগী পেট্রল উৎপাদন দুটি আলাদা ধাপ। তেল উত্তোলনের পর তা শোধনাগারে পরিশোধন করতে হয়। এরপর নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে জ্বালানি সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বিক্রয়কেন্দ্রে সরবরাহ করতে হয়। এই প্রতিটি ধাপের খরচ শেষ পর্যন্ত পেট্রলের খুচরা দামে প্রভাব ফেলে।
ক্যালিফোর্নিয়ার জ্বালানিবাজারের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের অন্য অনেক অঞ্চলের সঙ্গে অঙ্গরাজ্যটির পেট্রল পরিবহনের পাইপলাইন সংযোগ নেই। ফলে দেশের অন্য অঞ্চলে উৎপাদিত অতিরিক্ত জ্বালানি দ্রুত সেখানে পাঠানো কঠিন। সরবরাহ কমে গেলে বাইরের উৎস থেকে জাহাজে জ্বালানি আনতে হতে পারে, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।
ক্যালিফোর্নিয়া জ্বালানি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অঙ্গরাজ্যটির শোধনাগারগুলোতে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৬১ শতাংশ এসেছিল বিদেশ থেকে এবং প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছিল আলাস্কা থেকে। অর্থাৎ নিজস্ব তেল উৎপাদন থাকলেও ক্যালিফোর্নিয়ার জ্বালানি সরবরাহ আন্তর্জাতিক বাজার ও সমুদ্রপথের ওপরও নির্ভরশীল।
হাওয়াইয়ের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। দ্বীপপুঞ্জটি মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে জ্বালানি পরিবহনের খরচ বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু হাওয়াইয়ের নিজস্ব শোধনাগার রয়েছে, যা স্থানীয় চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। ফলে সেখানে সরবরাহের ধরন এবং বাজারের প্রতিযোগিতা ক্যালিফোর্নিয়ার তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। হাওয়াইয়ের দূরবর্তী অবস্থান একাই পেট্রলের দাম নির্ধারণ করে না; স্থানীয় শোধনক্ষমতা, সরবরাহের চুক্তি, কর এবং বিক্রয়ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালিফোর্নিয়ার পেট্রলের দাম বেশি থাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অঙ্গরাজ্যটির কঠোর পরিবেশগত মান। বায়ুদূষণ কমাতে সেখানে বিশেষ ধরনের পেট্রল ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এই পেট্রল উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট উপাদান ও পরিশোধনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চলে বিক্রি হওয়া পেট্রল সব সময় ক্যালিফোর্নিয়ার নির্ধারিত মান পূরণ করে না। ফলে অন্য অঙ্গরাজ্য থেকে সাধারণ পেট্রল এনে সরাসরি সেখানে বিক্রি করা সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এ ছাড়া গ্রীষ্ম ও শীতের জন্য পেট্রলের মিশ্রণ পরিবর্তনের বিষয়টিও উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে জটিল করে। বছরের বিভিন্ন সময়ে নির্ধারিত মান অনুযায়ী নতুন মিশ্রণের পেট্রল প্রস্তুত করতে হয়। এতে শোধনাগার পরিচালনা, মজুত এবং পরিবহনের পরিকল্পনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে শীতকালীন মিশ্রণে আগাম পরিবর্তনের উদ্যোগের কথা জানান। করও পেট্রলের উচ্চমূল্যের অন্যতম প্রধান কারণ। ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতি গ্যালন পেট্রলের ওপর অঙ্গরাজ্য কর, কেন্দ্রীয় কর এবং স্থানীয় বিক্রয়কর প্রযোজ্য। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে অঙ্গরাজ্যটির পেট্রলের ওপর নির্ধারিত কর ছিল প্রতি গ্যালনে ৬৩ দশমিক ৪ সেন্ট। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারিত ১৮ দশমিক ৪ সেন্ট কর যোগ হয়। ফলে বিক্রয়কর হিসাব করার আগেই এই দুই কর মিলিয়ে প্রতি গ্যালনে ৮১ দশমিক ৮ সেন্ট দাঁড়ায়। নির্দিষ্ট এলাকার বিক্রয়কর যুক্ত হলে মোট করের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। হাওয়াইয়ের ক্ষেত্রে পেট্রলের ওপর অঙ্গরাজ্যভিত্তিক আবগারি কর তুলনামূলকভাবে কম। প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতি গ্যালনে এই কর প্রায় ১৯ সেন্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও হাওয়াইয়ের সব এলাকার কর ও অন্যান্য খরচ এক নয়, তবু করের এই পার্থক্য দুই অঙ্গরাজ্যের পেট্রলের দামের ব্যবধান ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।
ক্যালিফোর্নিয়ার পরিবেশগত কর্মসূচির খরচও পেট্রলের মূল্যে প্রভাব ফেলে। অঙ্গরাজ্যটির জ্বালানি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কম কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং দূষণ কমানোর কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যয় পেট্রলের দামের একটি অংশ। এসব কর্মসূচির মধ্যে কম কার্বন জ্বালানি মান এবং নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ রয়েছে। তবে পরিবেশগত নিয়মের কারণে দাম বাড়ে বলেই এসব নীতি অপ্রয়োজনীয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। এগুলোর উদ্দেশ্য বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমানো; একই সঙ্গে ভোক্তাদের ওপর এর আর্থিক প্রভাবও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
শোধনাগারের সংখ্যা ও কার্যক্রমও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় দুটি শোধনাগার বন্ধ হওয়ার ঘটনা জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অঙ্গরাজ্যটির বাজার অন্য অঞ্চল থেকে সহজে জ্বালানি আনতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হলে সরবরাহের ওপর দ্রুত চাপ পড়তে পারে। তখন পাইকারি বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং তার প্রভাব খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রেও পড়তে পারে। তবে প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধির জন্য শোধনাগার বন্ধ হওয়াকেই একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম, শোধনাগারের মুনাফা, পরিবহন খরচ এবং বিক্রয়কেন্দ্রের নিজস্ব ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে যেসব মানুষের প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য গাড়ি ব্যবহার করতে হয়, যেসব পরিবার একাধিক গাড়ি চালায় এবং যেসব ছোট ব্যবসা পণ্য পরিবহনের জন্য যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল। পেট্রলের দাম বাড়লে পরিবারের যাতায়াতের ব্যয় বাড়ে। পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে কিছু ব্যবসা সেই ব্যয়ের অংশ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে দাম কতটা বাড়বে, তা ব্যবসার ধরন, প্রতিযোগিতা এবং অন্যান্য খরচের ওপর নির্ভর করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্যালিফোর্নিয়ায় উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি হলেই অঙ্গরাজ্যটিতে পেট্রলের দাম কম হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তেলের বাজার আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত। অপরিশোধিত তেলের দাম বিশ্ববাজারে পরিবর্তিত হলে উৎপাদনকারী অঙ্গরাজ্যেও জ্বালানির খরচ বাড়তে পারে। একইভাবে স্থানীয় শোধনক্ষমতা সীমিত হলে কিংবা পরিবহনব্যবস্থা দুর্বল হলে নিজস্ব উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও ভোক্তাদের বেশি দাম দিতে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনও আঞ্চলিক জ্বালানির দামের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে কর, পরিবহন, সরবরাহের বিঘ্ন, শোধনাগার এবং বিশেষ মানের জ্বালানির বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার উচ্চমূল্যের অর্থ এই নয় যে হাওয়াইয়ে পেট্রল সস্তা। ২০ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, হাওয়াইয়েও প্রতি গ্যালন সাধারণ পেট্রলের দাম ছিল ৫ ডলারের বেশি। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গড় দাম ছিল প্রায় ৪ দশমিক ২৮ ডলার। অর্থাৎ দুই অঙ্গরাজ্যেই জ্বালানির দাম জাতীয় গড়ের ওপরে ছিল, যদিও ক্যালিফোর্নিয়ার চালকদের ব্যয় ছিল আরও বেশি।