ফখরুদ্দীন-হাসিনার হাত ধরেই স্বৈরাচারের উত্থান, বগুড়ার উন্নয়নে বড় পরিকল্পনার ঘোষণা প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের
দীর্ঘদিনের উন্নয়নবঞ্চনা কাটিয়ে বগুড়াকে শিল্প, যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সিটি করপোরেশন, বিমানবন্দর, রেলপথ, হাসপাতাল ও শিল্প পার্ক ঘিরে একগুচ্ছ উন্নয়ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন তিনি। একই সভায় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেছেন, বগুড়ার উন্নয়নবঞ্চনার অবসান ঘটানো হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বগুড়া উন্নয়নবৈষম্যের শিকার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি। তিনি বলেছেন, গত ২০ বছরে বগুড়ার মানুষ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে বর্তমান সরকারের বগুড়াকে ঘিরে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নগর অবকাঠামোয় জেলার উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বগুড়ার মমইন কনভেনশন সেন্টারে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন আয়োজিত ‘বগুড়ার উন্নয়ন: সমস্যা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যে মীর শাহে আলম বলেন, বগুড়া উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার স্মারক পুণ্ড্রনগরীর ঐতিহাসিক পরিচয়ের পাশাপাশি কৃষি ও অর্থনীতিতে এ জেলার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। এত সম্ভাবনা থাকার পরও জেলাটি দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন পায়নি। বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র সাত মাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নয়নের সুফল দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে। তবে বগুড়ার অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে সরকার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
বগুড়ার বড় উন্নয়ন উদ্যোগগুলোর মধ্যে আরাফাত রহমান কোকো প্যারা স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। এ প্রকল্পে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বগুড়া বহুমাত্রিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রকল্পগুলোর বর্তমান অগ্রগতি, অনুমোদন ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সভায় আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন মীর শাহে আলম। তিনি জানান, এ প্রকল্পে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা রয়েছে। রেলপথটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বগুড়ার নগর উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলার উন্নয়নে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পৌরসভাগুলোর জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এ ছাড়া বগুড়া ওয়াসা ও বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি সরবরাহ, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শিল্পায়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বগুড়ায় বিসিক শিল্প পার্কের কাজ শিগগির শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিল্প পার্ক গড়ে উঠলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পের নির্দিষ্ট সময়সীমা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে বিভিন্ন মহাসড়ক চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। শহরের যানজট কমানো ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য প্রাথমিকভাবে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। করতোয়া নদীর পাশ দিয়ে চার লেনের সড়ক নির্মাণ, যমুনার ভাঙন রোধ এবং পানি সংরক্ষণে ড্যাম্প স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত প্রভাব, অর্থায়ন ও প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন নিয়েও একাধিক পরিকল্পনার কথা জানান মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, জেলার ১৩টি উপজেলায় ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বহুমাত্রিক কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন উপজেলায় ডাকবাংলো নির্মাণ ও উন্নয়নেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে হাসপাতালগুলোর অবস্থান, নির্মাণের সময়সূচি, চিকিৎসক-জনবল এবং পরিচালন ব্যয়ের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে পরিকল্পনার বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
জাতীয় উন্নয়ন বরাদ্দের প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সব অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। বক্তব্যে তিনি রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং গোপালগঞ্জ জেলার উন্নয়নে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়; দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নই সরকারের লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বক্তব্যে মীর শাহে আলম বলেন, ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার শাসনামল পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেশ গেছে। তাঁর অভিযোগ, ফখরুদ্দীন ও শেখ হাসিনার হাত ধরেই দেশে স্বৈরাচারী শাসনের উত্থান ঘটেছে। তিনি বিএনপির নেতা-কর্মীদের শুধু গত ১৭ বছরের নির্যাতনের কথা নয়, গত ২০ বছরের রাজনৈতিক নির্যাতন ও উন্নয়নবঞ্চনার কথাও তুলে ধরার আহ্বান জানান। এগুলো প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ; বক্তব্যে উত্থাপিত ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মূল্যায়নগুলোকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য থেকে পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন।
দলের ভেতরে অপপ্রচার ও বিদ্বেষের রাজনীতি বন্ধের আহ্বানও জানান তিনি। মীর শাহে আলম বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি নিজেদের দলেও অপপ্রচারকারীরা থাকতে পারে। হিংসা ও অপপ্রচারের পরিবর্তে ভালো কাজকে উৎসাহিত করে বগুড়ার স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
শহরের যানজট ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রতিটি বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের পরামর্শ দেন প্রতিমন্ত্রী। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বগুড়ার উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত থেকেছে। এ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে জেলার উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। তাঁর ভাষায়, গত ২০ বছরে বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে যে ভণ্ডামি হয়েছে, স্থানীয় মানুষ তার সাক্ষী।
আতিকুর রহমান রুমন আরও বলেন, বগুড়ার প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আরাফাত রহমান কোকোর নামে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হলেও সেটি অবহেলা ও অযত্নে পড়ে ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। বগুড়ার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন আতিকুর রহমান রুমন। তিনি দাবি করেন, দেশের কোথাও ন্যূনতম অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরতে হবে। সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো বক্তব্য বা তথ্য কারও বিরুদ্ধে গেলেও সরকার তা স্বাগত জানাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুহিত তালুকদার, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ ইসলাম আলমগীর পাভেল, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান, বগুড়া সিটি প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন, বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক আব্দুল মজিদ, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কুদরত-ই-জাহান, বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান, পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ, টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম, বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু, সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ, বগুড়া টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মোহন আকন্দ এবং নাজ গার্ডেনের স্বত্বাধিকারী শোকরানা।
সভায় বগুড়ার উন্নয়ন সম্ভাবনা, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে ঘোষিত প্রকল্পগুলোর বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য বরাদ্দের সরকারি নথি, অনুমোদন, দরপত্র, কাজ শুরুর তারিখ ও বাস্তবায়নের সময়সীমা যাচাই করা জরুরি। প্রতিশ্রুতিগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে বগুড়ার যোগাযোগ, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।





