মার্কিন নির্বাচনের পর ইরানে নতুন হামলার আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে যুদ্ধের উত্তাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন হামলার আশঙ্কা বাড়ছে; সামরিক প্রস্তুতি, কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও পাল্টা আঘাতের হুমকিতে আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার হতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে আগামী ৪ নভেম্বর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নতুন মিত্রবাহিনীর অভিযান শুরু হবে এমন কোনো নিশ্চিত ঘোষণা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে নির্দিষ্ট তারিখে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার দাবিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সহযোগী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানকে ঘিরে সংঘাত সীমিত রাখার পক্ষে ছিলেন। নির্বাচনের পর সামরিক হামলা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু করার বিষয়ে তখন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এদিকে ৮ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য সুফান সেন্টারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই নতুন করে সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যদিও কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রয়েছে। বিশ্লেষণটিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিরোধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। তবে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আলোচনা আর বাস্তবে অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়।
১৩ অক্টোবর প্রকাশিত টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ইরান সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় পরমাণু স্থাপনাগুলোর প্রতিরক্ষা জোরদার করছে। একই সঙ্গে দেশটির জনগণকে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসে। ইরানের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নতুন করে হামলা হতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ইরান সম্ভাব্য মার্কিন হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী, জাহাজ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। তবে এসব হুমকি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়, নিশ্চিত হামলার সময়সূচি নয়।
ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গত ২১ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও বাড়লে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, সে বিষয়ে ইসরায়েল পরিকল্পনা তৈরি করছিল। তবে তখনকার প্রতিবেদনে ইসরায়েলের তাৎক্ষণিকভাবে নতুন অভিযানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি। তাই ইসরায়েল পরবর্তী পর্যায়ের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রে কোন সময়ের ঘোষণা এবং কোন সামরিক পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করা জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে ৪ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া দাবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী সময়সূচি। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্ধারিত দিন ৩ নভেম্বর। ফলে নির্বাচনের পরদিন থেকেই যুদ্ধ শুরু হবে বলে দাবি করা হলে সেটির পক্ষে সরাসরি সরকারি ঘোষণা, সামরিক নির্দেশনা কিংবা নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের সমর্থন থাকা প্রয়োজন। কেবল নির্বাচনের আগে সংঘাত সীমিত রাখার রাজনৈতিক হিসাব থেকে পরদিন অভিযান শুরু হবে এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
২০ অক্টোবর রয়টার্সের প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অচলাবস্থা বজায় রেখে মার্কিন নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করছে বলে কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তা মনে করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তেহরান নতুন মার্কিন বা ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কা করছে এবং আলোচনায় ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এই তথ্য দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস ও কূটনৈতিক জটিলতার গভীরতা বোঝায়।
সংঘাত নতুন করে বাড়লে এর প্রভাব শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালিত হয়। সেখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তেলের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, বিমা খরচ এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে চাপ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্যও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত উদ্বেগের কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তবে নতুন হামলা না ঘটলে কিংবা সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে সম্ভাব্য প্রভাবের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। তাই যুদ্ধ শুরু হয়েছে বা জ্বালানির দাম নিশ্চিতভাবে বাড়বে এমন সিদ্ধান্ত আগাম দেওয়া উচিত নয়।
নির্বাচনের পর ইরানকে ঘিরে মার্কিন সামরিক চাপ বাড়ার আশঙ্কার পক্ষে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কিছু তথ্য ও বিশ্লেষণ রয়েছে। ইরানের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার পরিকল্পনাও পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলছে। কিন্তু আগামী ৪ নভেম্বর নতুন মিত্রবাহিনীর অভিযান নিশ্চিতভাবে শুরু হবে এই নির্দিষ্ট দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কূটনৈতিক আলোচনা, সংশ্লিষ্ট সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের পরবর্তী প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করেই পরিস্থিতির প্রকৃত গতিপথ নির্ধারণ করা সম্ভব।





