সরাসরি মানচিত্র, পূর্বাভাস ও জরিপের গড়: PoliAgg (CC BY-SA 4.0)

পূর্ণ ফলাফল, মানচিত্র ও জরিপ
ব্রেকিং
ক্যালিফোর্নিয়ায় স্কুলে গুলির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দুই কিশোরী গ্রেপ্তার, তদন্তে নতুন তথ্য প্রকাশরাশিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন চার বছর বন্দি থাকা মার্কিন শিক্ষকতেহরানের ব্যস্ত চত্বরে খাঁচায় বন্দি ট্রাম্পের ছদ্মবেশী শিল্পী, ছবি তুলতে ভিড় পথচারীদেরযুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি নির্মাণ কমেছে, ঋণের সুদ ও বাড়তি খরচে বিপাকে সাধারণ পরিবারগুলোনিউ জার্সিতে আইসিইর অভিযানে একাধিক ব্যক্তি আটক, ধাক্কাধাক্কির অভিযোগের পর বিক্ষোভ

রাশিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন চার বছর বন্দি থাকা মার্কিন শিক্ষক

ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আটক মার্কিন শিক্ষক স্টিফেন হাবার্ড চার বছরের বেশি সময় পর রাশিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন, স্বস্তি ফিরেছে পরিবারে।

রাশিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন চার বছর বন্দি থাকা মার্কিন শিক্ষক
রাশিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন চার বছর বন্দি থাকা মার্কিন শিক্ষক

২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর, বুধবার, রাশিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্টিফেন হাবার্ড। ৭৪ বছর বয়সী এই মার্কিন নাগরিক চার বছরেরও বেশি সময় রুশ হেফাজতে ছিলেন। ইউক্রেন যুদ্ধে ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে রাশিয়ার আদালত তাঁকে ছয় বছর ১০ মাসের কারাদণ্ড দেন। দীর্ঘ বন্দিজীবনের অবসান ঘটিয়ে তাঁর মুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর পরিবার ও আইনজীবীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই এই মুক্তির ঘটনা ঘটেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় তিনি হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই অনুরোধের পরই পুতিন তাঁকে মুক্তি দিতে সম্মত হন। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, হাবার্ডের মুক্তির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো বন্দিকে রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে হয়নি। তবে মুক্তির সিদ্ধান্তের পেছনে দুই দেশের আলোচনার সব শর্ত বা অভ্যন্তরীণ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে মুক্তির বিষয়টি সামনে আসে সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের বৈঠকের সময়। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি হাবার্ডের মুক্তি বৈঠকটির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় পরিণত হয়। রুশ প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানবিক বিবেচনায় তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এরপর হাবার্ডকে সেন্ট পিটার্সবার্গের বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। প্রকাশিত ভিডিওতে উইটকফের সঙ্গে তাঁর করমর্দন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দৃশ্য দেখা যায়।

হাবার্ডের মুক্তির খবর তাঁর পরিবারের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বোন প্যাট্রিসিয়া হাবার্ড ফক্স সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভাইয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় তিনি তাঁকে অবিশ্বাস ও আনন্দের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুনেছেন। দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পাওয়ার ঘটনাটি হাবার্ডের কাছেও যেন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। তাঁর বোনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাইটি একসময় আশঙ্কা করেছিলেন যে হয়তো কারাগারেই তাঁর জীবন শেষ হবে। পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় ছিলেন।
তবে মুক্তির খবরের পাশাপাশি তাঁর বন্দিজীবনের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। হাবার্ডের বোনের অভিযোগ, বন্দি অবস্থায় তিনি মারধর ও অনাহারের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর স্বাস্থ্যও আগের মতো নেই বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যার কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি তাঁর মানসিক আঘাতজনিত জটিলতা থাকতে পারে বলেও বোন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এসব বক্তব্য পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া অভিযোগ; স্বাধীনভাবে প্রতিটি ঘটনার সত্যতা যাচাই করা যায়নি। মুক্তির পর তাঁর শারীরিক ও মানসিক পুনরুদ্ধারই এখন পরিবারের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।

হাবার্ডের বিরুদ্ধে রাশিয়ার অভিযোগের সূত্রপাত ২০২২ সালে। রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর পূর্ব ইউক্রেনের ইজিয়ুম শহর রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ওই সময় শহরটিতে অবস্থান করছিলেন হাবার্ড। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে আটক করা হয়। রুশ কৌঁসুলিদের দাবি ছিল, তিনি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিরক্ষা ইউনিটে যোগ দিয়েছিলেন এবং ইউক্রেনীয় বাহিনীর পক্ষে লড়াই করেছিলেন। রুশ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেওয়া হয়েছিল এবং মাসিক অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল।
২০২৪ সালের অক্টোবরে মস্কোর একটি আদালত তাঁকে ছয় বছর ১০ মাসের কারাদণ্ড দেন। বিচারটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রুশ সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছিল, হাবার্ড অভিযোগ স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিবার ও আইনজীবীরা এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাবার্ড শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন এবং তাঁর সামরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কথা তাঁরা বিশ্বাস করেন না। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইনজীবীও বলেছেন, হাবার্ড তাঁকে জানিয়েছিলেন যে অভিযোগগুলো মিথ্যা এবং তিনি কোনো সামরিক ইউনিটে ছিলেন না। ফলে মামলার অভিযোগ ও হাবার্ডের ভূমিকা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রশাসন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হাবার্ডকে অন্যায়ভাবে আটক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এমন স্বীকৃতি সাধারণত কূটনৈতিকভাবে মুক্তি আদায়ের প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিতে সহায়তা করে। তাঁর আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে মুক্তির জন্য কাজ করেছেন। আইনজীবীদের প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, চার বছরেরও বেশি সময় রুশ হেফাজতে থাকার পর অবশেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের কাছে ফিরছেন। পরিবার এক বিবৃতিতে মুক্তির জন্য মার্কিন প্রশাসন ও আইনি দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে এবং হাবার্ডের ব্যক্তিগত জীবন ও সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য কিছুটা গোপনীয়তা চেয়েছে।
হাবার্ডের মুক্তির সময়টি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। উইটকফের সেন্ট পিটার্সবার্গ সফরেও যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন আলোচনাকে অগ্রগতির লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরলেও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে এখনো বড় ধরনের সমঝোতা হয়নি। হাবার্ডের মুক্তি মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে, কিন্তু এই একটি ঘটনা দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের সব জটিলতা দূর হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বৈঠকে উইটকফ পুতিনকে মানবিক ব্যক্তি হিসেবে প্রশংসা করেন। তাঁর এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার জন্ম দেয়। সমালোচকদের বক্তব্য, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান এবং আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে বিতর্ক চলমান থাকা অবস্থায় পুতিনকে এভাবে প্রশংসা করা যথাযথ নয়। অন্যদিকে ট্রাম্প হাবার্ডের মুক্তিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের ইতিবাচক ফল হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায়, একজন বন্দির মুক্তি মানবিক স্বস্তি এনে দিলেও তা বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে থাকেনি।
হাবার্ডের ঘটনাটি বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে আটকে পড়া মানুষের ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে। তিনি ২০১৪ সাল থেকে ইউক্রেনে বসবাস করছিলেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর বিদেশি নাগরিকদের আটক, গুপ্তচরবৃত্তি বা ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে অভিযুক্ত করার ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। এ ধরনের মামলায় অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং বন্দির অধিকার নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাবার্ডের মামলায় তাঁর পরিবার ও আইনজীবীদের বক্তব্য এবং রুশ কর্তৃপক্ষের অভিযোগের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, স্টিফেন হাবার্ডের মুক্তি তাঁর পরিবারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে, আর বন্দিজীবনে তাঁর স্বাস্থ্য কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা আরও পরিষ্কার হবে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন ও চিকিৎসার পর। মুক্তির ঘটনাটি ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান নয়; বরং চলমান সংঘাতের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে মানবিক সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে।


ট্যাগ: স্টিফেন হাবার্ডরাশিয়াযুক্তরাষ্ট্রমার্কিন শিক্ষকবন্দিমুক্তিইউক্রেন যুদ্ধডোনাল্ড ট্রাম্পভ্লাদিমির পুতিনস্টিভ উইটকফআন্তর্জাতিক কূটনীতিমানবিক মুক্তি

প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সিএসবি নিউজ ইউএসএ ফলো করুন

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।