যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অবৈধ অভিবাসী মুক্তি শূন্য, ইতিহাস গড়ার দাবি ট্রাম্পের
ট্রাম্প বলছেন দক্ষিণ সীমান্তে আটক অবৈধ অভিবাসীদের কাউকেই ছাড়া হচ্ছে না, তবে তথ্য বলছে সীমান্তে প্রবেশ ও আটক এখনও চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে আটক অভিবাসীদের মুক্তি দেওয়ার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্ট এমন সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। তবে তাঁর এই দাবির ব্যাখ্যা এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানে সীমান্তে অভিবাসীদের আটক করার সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি সীমান্তরক্ষীদের হাতে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও শূন্য বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ প্রবেশের সব চেষ্টা বন্ধ হয়ে গেছে।
গত ১৭ অক্টোবর ট্রাম্প কেনটাকিতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে দাবি করেন, গত ১৭ মাসে দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে কোনো অবৈধ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টচেক ডট অর্গের ২০২৬ সালের অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর বক্তব্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরকারি তথ্যের সঙ্গে মেলে। দেশটির শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সাময়িকভাবে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা টানা ১৭ মাস বন্ধ ছিল। তবে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ প্রবেশের সব চেষ্টা বন্ধ হয়ে গেছে এমন দাবি সঠিক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ ও সীমান্ত সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক ঘোষণায় জানিয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে আটক ব্যক্তির সংখ্যা আগের প্রশাসনের সময়ের তুলনায় প্রায় ৯৫ শতাংশ কমেছে। ওই অর্থবছরে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে মোট ৯৮ হাজার ৭০৮ জনকে আটক করা হয়েছে বলে প্রাথমিক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে সীমান্তরক্ষীদের হাতে আটক ব্যক্তির মোট সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৯ হাজার ২৪৩। কর্তৃপক্ষের দাবি, সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে না দেওয়ার নীতি কার্যকর থাকায় অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের মোট সংখ্যা এক বিষয় নয়। সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা পড়া ব্যক্তিদের হিসাব সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু কেউ নজরদারি এড়িয়ে সীমান্ত অতিক্রম করলে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এ ধরনের কিছু অনুপ্রবেশের তথ্য সংগ্রহ করে, যেগুলোতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নজরদারিতে ধরা পড়লেও গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান। ফলে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার সংখ্যা শূন্য হলেও অবৈধ প্রবেশের মোট সংখ্যা শূন্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ফ্যাক্টচেক ডট অর্গের অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক কর্মকর্তার প্রকাশিত তথ্যে ২ হাজার ১২৩ জন এবং জুন মাসে ৯৮৬ জন এমন ব্যক্তির কথা উল্লেখ ছিল, যাঁরা সীমান্ত অতিক্রম করে কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়েননি। পরে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও ৬ হাজার ৮১৫ জনের হিসাব পাওয়া যায়। এসব তথ্য ২০২৫ সালের নির্দিষ্ট সময়ের হলেও অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা ও আটক এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা যে শূন্য ছিল না, তা বোঝায়। তবে এই পরিসংখ্যান দিয়ে ২০২৬ সালের প্রতিটি মাসে কতজন অনুপ্রবেশ করেছেন, তা নির্ধারণ করা যায় না।
ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশের নিয়ম কঠোর করেছে, বহিষ্কারের ব্যবস্থা বাড়িয়েছে এবং সীমান্তে নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে মানব পাচারকারী চক্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা কমেছে। সীমান্তে অতিরিক্ত নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আইন প্রয়োগের ওপর জোর দেওয়াও এই নীতির অংশ। তবে অবৈধ প্রবেশ কমে যাওয়ার পেছনে প্রতিটি পদক্ষেপের পৃথক প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণ করতে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।
অভিবাসন নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র। ট্রাম্পের সমর্থকেরা সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে না দেওয়ার নীতিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, কঠোর আইন প্রয়োগ অবৈধ প্রবেশে নিরুৎসাহিত করতে পারে। অন্যদিকে অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা, আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ এবং মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি অধিকার ও মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে ছেড়ে দেওয়া, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার হেফাজত থেকে মুক্তি এবং বহিষ্কারের পরিসংখ্যান আলাদা বিষয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনী কাউকে ছেড়ে না দিলেও পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের হেফাজত থেকে মুক্তির ঘটনা ঘটতে পারে। আবার সীমান্তের বাইরে আটক হওয়া ব্যক্তিদের হিসাবও সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের পরিসংখ্যানের সঙ্গে এক নয়। তাই সরকারের ঘোষণায় কোন ধরনের মুক্তির কথা বলা হচ্ছে, তা জানা জরুরি।
ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা ও আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা শূন্য থাকার দাবিও সরকারি ঘোষণায় সমর্থিত। কিন্তু অবৈধ প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই। সুতরাং ট্রাম্পের বক্তব্যকে মূল্যায়ন করার সময় সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং অবৈধভাবে প্রবেশের প্রকৃত পরিস্থিতিকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।





